জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দুই ইউনিয়নে তালবীজ রোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে চরবিশ্বাস ও পানপট্টি ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়কের পাশে দুই কিলোমিটারের বেশি এলাকায় ৫৫০টিরও বেশি তালবীজ রোপণ করা হয়।
পরিবেশ সুরক্ষা, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, উপকূলীয় এ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
চরবিশ্বাসে দুই কিলোমিটার সড়কে তালবীজ
চরবিশ্বাস ইউনিয়নে লোকমোর্চার উদ্যোগে এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এনএসএস বাস্তবায়িত গেটকা প্রকল্পের আওতায় তালবীজ রোপণ করা হয়। দক্ষিণ চরবিশ্বাস গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে খলিফা বাড়ি থেকে রাঢ়ি বাড়ি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে তিন শতাধিক তালবীজ রোপণ করেন স্থানীয়রা।
কর্মসূচিতে লোকমোর্চার সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন। সড়কের দুই পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে তালবীজ রোপণ করা হয়। আয়োজকদের আশা, নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করা গেলে এসব তালগাছ ভবিষ্যতে এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত সিভিক ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য মীর মস্তফা কামাল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষায় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যতেও এমন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পানপট্টিতেও রোপণ ২৫০ তালবীজ
একই প্রকল্পের আওতায় পানপট্টি ইউনিয়নেও তালবীজ রোপণ করা হয়েছে। গত ১৫ আগস্ট ইউনিয়ন লোকমোর্চার উদ্যোগে এবং ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় পানপট্টি সেন্টার বাজার থেকে পানপট্টি দাখিল মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের পাশে ২৫০টি তালবীজ রোপণ করা হয়।
এ কর্মসূচিতেও লোকমোর্চার সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন পানপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন।
তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। স্থানীয় পর্যায়ে তালগাছসহ বিভিন্ন দেশীয় গাছের সংখ্যা বাড়াতে আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, রোপণ করা গাছগুলোর পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় তালগাছের গুরুত্ব
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় গলাচিপায় প্রতিবছর নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন দুর্যোগের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর পড়ছে। এ অবস্থায় স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সবুজ আচ্ছাদন বাড়াতে বৃক্ষরোপণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের মতে, তালগাছ দীর্ঘস্থায়ী ও পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ হিসেবে গ্রামীণ জনপদে গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার পাশে তালগাছের সারি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ায়, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে। বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলা, মাটির স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তালগাছের গুরুত্ব রয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
আয়োজকরা জানান, তালবীজ রোপণের পর সেগুলোর পরিচর্যা ও সংরক্ষণে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু কর্মসূচি পালন নয়, রোপণ করা প্রতিটি বীজকে গাছে পরিণত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
পরিবেশকর্মীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে এ ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করা গেলে উপকূলীয় জনপদে সবুজায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।
মতামত