সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষর জাল করে শিক্ষক নিয়োগের দাবি, রেজুলেশন বই গায়েবের অভিযোগ
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা আব্দুর রশিদ খান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ, কলেজের রেজুলেশন বই এবং গভর্নিং বডি গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের স্বাক্ষর জাল করে কয়েকজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করার চেষ্টা এবং পুরোনো রেজুলেশন বই গায়েব করার অভিযোগও করেছেন কলেজ পরিচালনা কমিটির এক সদস্য, শিক্ষক ও স্থানীয় অভিভাবকেরা।
এসব অভিযোগ তুলে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে কলেজের একটি কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. নাসির উদ্দিনসহ স্থানীয় অভিভাবকেরা। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগগুলোর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে নওমালা আব্দুর রশিদ খান ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠার বছরই, ১৫ জুলাই, আবুল কালাম আজাদ কলেজটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে উচ্চ মাধ্যমিকের পাশাপাশি ২০০৮ সালে স্নাতক শাখায় শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি পায় প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল পর্যন্ত স্নাতক শাখায় ২৯ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের কেউ কেউ এমপিওভুক্ত না হলেও করোনাকালীন সময়ে সরকারিভাবে পাঁচ হাজার টাকা করে ভাতা পেয়েছিলেন।
২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ অবসরে যাওয়ার পর একই কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবদুল মালেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ওই বছরের ২০ আগস্ট তিনি অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান।
সংবাদ সম্মেলনে কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. ইউনুচ মৃধা বলেন, স্নাতক শাখার যে ২৯ জন শিক্ষক করোনাকালীন সরকারি ভাতা পেয়েছেন, তাঁদের নিয়োগ বৈধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁরা জানতে পারেন, পদার্থবিদ্যা বিষয়ে প্রভাষক লেমন রায়, ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে প্রভাষক মো. মাসুদ এবং লাইব্রেরিয়ান বিষয়ে প্রভাষক মো. বাহাউদ্দিন এমপিওভুক্ত হয়েছেন। তাঁর দাবি, এমপিওভুক্ত হওয়ার আগে এসব শিক্ষককে নিয়মিত কলেজে দেখা যায়নি এবং করোনাকালীন ভাতাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তালিকাতেও তাঁদের নাম ছিল না।
কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. নাসির উদ্দিন অভিযোগ করেন, ২০০৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মো. আসাদুজ্জামানকে স্নাতক শাখার ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি যোগদান করেন। তিনি করোনাকালীন সরকারি ভাতাও পেয়েছেন। কিন্তু তাঁকে বাদ দিয়ে একই বিষয়ে মোছা. নাছিমাকে সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের স্বাক্ষর স্ক্যান করে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাসির উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, কলেজের গভর্নিং বডি গঠনের ক্ষেত্রেও অধ্যক্ষ আবদুল মালেক স্বেচ্ছাচারিতা করছেন। তাঁর দাবি, নিয়মিত গভর্নিং বডির পরিবর্তে দীর্ঘ সময় ধরে এডহক কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কলেজের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের সময়ের নিয়োগসংক্রান্ত রেজুলেশন বইটি গায়েব করে নতুন রেজুলেশন বইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষর জাল করে স্নাতক শাখার বিভিন্ন পদে অন্তত ২০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেন তাঁরা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা নথি সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্নাতক শাখার প্রভাষক আবদুর রহিম বলেন, তিনি বৈধভাবে নিয়োগ পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করছেন এবং করোনাকালীন সরকারি ভাতাও পেয়েছেন। এরপরও এমপিওভুক্তির জন্য তাঁর নাম পাঠানো হচ্ছে না। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রসায়ন বিষয়ের শিক্ষক মো. লিটন এবং ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান।
এ ছাড়া কলেজের তিন শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির গাছ বিক্রি করে সেই অর্থ প্রতিষ্ঠানের কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, গাছ বিক্রির অর্থের পরিমাণ প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকা। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ আবদুল মালেক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরাই এমপিওভুক্ত হচ্ছেন। সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষর জাল করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়।
করোনাকালীন ভাতা পাওয়া শিক্ষকদের বাদ দিয়ে অন্যদের কীভাবে এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ বলেন, পর্যায়ক্রমে সবাই এমপিওভুক্ত হবেন।
রেজুলেশন বই হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আবদুল মালেক বলেন, রেজুলেশন বইটি হারিয়ে যাওয়ার পর এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পরে নতুন রেজুলেশন বই কেনা হয়েছে।
এদিকে সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের স্বাক্ষরিত বলে দাবি করা এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও ৬৮ জন শিক্ষকের একটি তালিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই তালিকায় ২০ জনের নামের পাশে সাবেক অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে ‘ভুয়া নিয়োগ’ সংক্রান্ত মন্তব্য লেখা রয়েছে।
অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য ও নথিপত্র ঘিরে নওমালা আব্দুর রশিদ খান ডিগ্রি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
মতামত