ইলিশ আহরণে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য বরাদ্দ খাদ্য সহায়তার তালিকায় নাম না থাকায় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার অনেক প্রকৃত জেলে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বছরের পর বছর নদী-খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের কেউ কেউ তালিকা থেকে বাদ পড়লেও সেখানে অ-জেলেদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ শিকার বন্ধ থাকায় জেলেদের জীবন-জীবিকা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। তবে তালিকায় প্রকৃত জেলেদের নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে তালিকা যাচাই ও হালনাগাদ করার কথা জানানো হলেও বর্তমানে তালিকার বাইরে থাকা জেলেরা পরিবার নিয়ে আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
এমনই একজন ভুক্তভোগী গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ কালিকাপুর গ্রামের শাহ আলম গাজী (৫০)। তিনি চানমিয়া গাজীর ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বোয়ালিয়ার খালে নৌকা ও জাল নিয়ে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শাহ আলম।
শাহ আলম গাজী জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে দক্ষিণ কালিকাপুর আবাসন প্রকল্পসংলগ্ন বোয়ালিয়ার খালে নিয়মিত মাছ ধরছেন তিনি। মাছ ধরার জন্য তাঁর নিজস্ব নৌকা ও জাল রয়েছে। মাছ বিক্রি করেই চলে তাঁর সংসারের খরচ। কিন্তু ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলেদের জন্য দেওয়া খাদ্য সহায়তার তালিকায় তাঁর নাম নেই।
তিনি বলেন, মাছ ধরাই তাঁর পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। নিষেধাজ্ঞার সময় নদী-খালে মাছ ধরতে না পারায় আয় বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় সরকারি খাদ্য সহায়তা না পেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
শাহ আলম গাজীর ভাষায়, ‘বহু বছর ধরে খালে জাল ফেলে মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছি। আমার নিজের নৌকা ও জাল রয়েছে। এরপরও খাদ্য সহায়তার তালিকায় নাম না থাকায় কষ্ট পাচ্ছি। নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরতে পারি না, তখন সরকারি সহায়তাটুকুই আমাদের ভরসা। উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ, বিষয়টি যাচাই করে আমার নাম তালিকাভুক্ত করা হোক।’
শাহ আলমের বাবা চানমিয়া গাজীও ছেলের জেলে পরিচয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর দাবি, তাঁর ছেলে দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরার পেশার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় ব্যবসায়ী সালমা বেগমও জানান, শাহ আলমের কাছ থেকে নিয়মিত মাছ কিনেছেন তাঁরা। তাঁর জীবিকার প্রধান উৎস মাছ শিকার।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহ আলম মাঝি বলেন, শাহ আলম গাজী প্রকৃত জেলে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। দ্রুত তাঁকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করেননি সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। ডালগাচিপা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল নবীও বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই জেলেদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে কোনো প্রকৃত জেলে বাদ পড়ে থাকলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞার সময় নদী ও খালে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তাঁদের আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে সরকারি সহায়তা তাঁদের পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। তাই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
তাঁদের অভিযোগ, তালিকায় কোনো অ-জেলে থাকলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এতে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যের পাশাপাশি জেলেদের জন্য নেওয়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ বিষয়ে স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা পুনরায় যাচাই করে নদী ও খালে নিয়মিত মাছ শিকার করেন—এমন জেলেদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। পাশাপাশি যাঁদের নৌকা, জাল ও মাছ ধরার পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে, তাঁদের তথ্য যাচাই করে দ্রুত খাদ্য সহায়তার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
শাহ আলমের মতো কোনো প্রকৃত জেলে যাতে সরকারি সহায়তার তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, সে জন্য প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কার্যকর নজরদারি এবং নিয়মিত তালিকা হালনাগাদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মতামত