পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের একটি সড়ক নিয়ে উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। এলজিইডির নথিতে ‘বিসি বা বিটুমিনাস কনক্রিট’ সড়ক হিসেবে উল্লেখ থাকা প্রায় এক কিলোমিটার সড়কে দুই দফায় বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে দৃশ্যমান কোনো পাকা সড়ক নেই। বছরের পর বছর ধরে কাঁচা, কাদামাটিতে পরিণত হওয়া সড়কটি ব্যবহার করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা।
অভিযোগ উঠেছে, বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রহমান ব্যাপারীর বাড়ি পর্যন্ত সড়কটির বরাদ্দের অর্থ অন্য একটি সড়কে ব্যয় করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি মহলের স্বার্থে অনুমোদিত সড়কের অর্থ অন্যত্র ব্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
দশমিনা উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রহমান ব্যাপারীর বাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কটি এলজিইডির নথিতে ৫৭৮৫২৫১৩৩ নম্বরের বিসি সড়ক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি পাকাকরণের তথ্য রয়েছে।
পরবর্তীতে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু সংরক্ষণ ও সংস্কার (জিওবি-এম) প্রকল্পের আওতায় সড়কটির সংস্কারের জন্য ৩৩ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় মেসার্স একতা এন্টারপ্রাইজ। চলতি বছরের ২৩ মার্চ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করেছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর ২৭ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়।
সড়কটির সংস্কারকাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন দশমিনা উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমান। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের আওতায় কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ওই সড়কে নতুন নির্মাণ বা সংস্কারের কোনো কাজ হয়নি। সরেজমিনেও সড়কটিকে কাঁচা ও কাদামাটিযুক্ত অবস্থায় দেখা গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
‘৪০ বছরেও উন্নয়ন হয়নি’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় চার দশক ধরে সড়কটি কাঁচাই রয়েছে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করেন। সড়কজুড়ে খানাখন্দ থাকায় যানবাহন চলাচলও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়; কোথাও কোথাও হাঁটুসমান কাদা জমে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনিস খান, জাহাঙ্গীর হোসেন, মহিবুল খান ও ফোরকান দালাল অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন-নিবেদনের পর তারা সড়কটির উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করাতে সক্ষম হন। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত কাজ হয়নি।
তাদের অভিযোগ, এলজিইডির কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ওই সড়কের বরাদ্দ অন্যত্র ব্যবহার করেছেন। তাদের দাবি, একই ইউনিয়নের চাঁনমিয়া সিকদার সড়ক নামে আরেকটি সড়কে পিচঢালা কাজ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁনমিয়া সিকদার সাবেক বিচারপতি জহিরুল ইসলামের আত্মীয়।
বরাদ্দের অর্থ অন্য সড়কে ব্যয়ের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রহমান ব্যাপারীর বাড়ি পর্যন্ত সড়কের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহার করে চাঁনমিয়া সিকদারের বাড়ির সামনের সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের দাবি, ওই সড়কের জন্য পৃথক অনুমোদন বা আইডি নম্বর নেই।
এমনকি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে মূল সড়কটির সংস্কারের জন্য আবারও প্রায় ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলে সেই অর্থও চাঁনমিয়া সিকদারের বাড়ির সামনের সড়কে সংস্কারকাজে ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একই সড়কের উন্নয়নের নামে একাধিকবার বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্পভুক্ত মূল সড়কটি এখনো কাঁচা রয়ে গেছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঠিকাদারের দাবি, ‘শিডিউল অনুযায়ী কাজ করেছি’
সংস্কারকাজের ঠিকাদার মো. মাসুদ রানা বলেন, তিনি নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে কাজটি পেয়েছেন। পরে এসও ও উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা অনুযায়ী যে সড়কে কাজ করতে বলা হয়েছে, সেখানেই শিডিউল অনুযায়ী কাজ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, প্রকল্পের নির্ধারিত কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন করেই তিনি চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করেছেন।
প্রকৌশলীর বক্তব্যে উঠল ‘ভুলের’ প্রসঙ্গ
অভিযোগের বিষয়ে সড়কটির তদারক কর্মকর্তা উপসহকারী প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমান বলেন, তিনি কারও কাছ থেকে কোনো অবৈধ সুবিধা নেননি। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে যে সড়কের কাজ হয়েছিল, তিনি সেই সড়কেই কাজ করেছেন বলে দাবি করেন।
একটি সড়কের বরাদ্দের অর্থ দিয়ে অন্য সড়ক নির্মাণ বা সংস্কার করা যায় কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভুল তো আগেই হয়েছে, আমার কিছু করার নেই।’
সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী মকবুল হোসেন ও হিসাবরক্ষক মো. চাঁন মিয়া বর্তমানে অন্যত্র বদলি হওয়ায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের আশ্বাস বর্তমান প্রকৌশলীর
দশমিনা উপজেলা এলজিইডির বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী এটিএম সাদিকুর রহমান বলেন, একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের নামে বরাদ্দ হওয়া অর্থ দিয়ে আইডিবিহীন অন্য কোনো সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, কাজটি তার যোগদানের আগে সম্পন্ন হয়েছে। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই। তবে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওয়ালিয়ার রহমানের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
দুই দফা বরাদ্দের পরও প্রকল্পভুক্ত সড়কটি কাঁচা থাকার অভিযোগ এবং বরাদ্দের অর্থ অন্যত্র ব্যবহারের দাবিকে ঘিরে এখন সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নের তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকল্পের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা জনসমক্ষে পরিষ্কার করা হোক।
মতামত