পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ‘স্বপ্নে পাওয়া ফুল ও হাড়’ ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়ার দাবিকে ঘিরে ব্যাপক কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মালেক শরীফের বাড়িতে কথিত এই চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসছেন। কেউ কেউ চিকিৎসা নেওয়ার পর শারীরিকভাবে উপকার পাওয়ার দাবি করায় ওই বাড়িতে রোগী ও দর্শনার্থীদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মস্তফা বয়াতি আগে দিনমজুরি ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেন, ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে বিশেষ একটি ফুল ও হাড়ের সন্ধান পেয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বপ্নে পাওয়া ওই ফুল, পানি ও তেল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ থেকে মানুষকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। এ কথা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তার বাড়িতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রোগীদের আনাগোনা শুরু হয়।
মস্তফা বয়াতির দাবি, কয়েকদিন আগে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি স্বপ্নে বাড়ির পেছনের বাগানে একটি বিশেষ ফুল দেখতে পান। পরে সেই ফুল বাড়িতে এনে একটি পাত্রে রাখার পর সকালে সেখানে কিছু হাড় দেখতে পান বলে জানান তিনি। এরপর স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে মানুষের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন।
তিনি জানান, চিকিৎসা নিতে আসা প্রত্যেকের কাছ থেকে ২১ টাকা করে ‘হাদিয়া’ নেওয়া হয়। তার দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দেওয়া হয়। পাশাপাশি সিন্নি ও খিচুড়ি রান্না করে আগত মানুষদের খাওয়ানো হয়।
এদিকে কথিত এই চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজনের সঙ্গে কথা বললে তারা বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাদের কেউ কেউ ফুল, পানি ও তেল ব্যবহারের পর আগের তুলনায় শারীরিকভাবে স্বস্তি অনুভব করছেন বলে দাবি করেন।
শ্রীরামপুর ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক ব্যক্তি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ তার মাকে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে দেখানো হলেও প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। পরে মস্তফা বয়াতির কাছে নিয়ে আসার পর তার মা কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে এসব দাবির স্বতন্ত্র চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক যাচাই পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বপ্নে পাওয়া ফুল, পানি বা তেল ব্যবহার করে রোগ নিরাময়ের দাবির পেছনে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। দুমকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. জি এম এনামুল হক বলেন, স্বপ্নে পাওয়া ফুল, পানি পড়া কিংবা এ ধরনের কোনো পদ্ধতিতে রোগ নিরাময়ের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের পর রোগীর সাময়িক ভালো লাগতে পারে। এর পেছনে মানসিক প্রভাব বা প্লেসবো ইফেক্ট ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ রোগীরা যদি নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ বাদ দিয়ে অনিশ্চিত কোনো চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন, তাহলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, কোনো রোগের লক্ষণ দেখা দিলে স্বীকৃত চিকিৎসাব্যবস্থার আওতায় গিয়ে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে জটিল বা গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসা বাদ দিয়ে বিকল্প কোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে ‘স্বপ্নে পাওয়া ফুল’ দিয়ে চিকিৎসার এই দাবি ঘিরে এলাকায় কৌতূহল তৈরি হলেও এর সত্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি অসুস্থ মানুষ যাতে যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মতামত