পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩ বছর বয়সী এক শিশুকে মারধরের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ঘটনার পর শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হলেও অভিযুক্ত বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার দাবি করেছেন, শিশুটি তাঁর ‘রক্তের নাতি’ এবং চুরির অভিযোগে তাকে শাসন করতে গিয়ে ভুল হয়েছে।
ঘটনাটি উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নের বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় শিশু জিসান হাওলাদার ও তার মা নাজমা বেগম বর্তমানে কলাপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে চাকামইয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল হাই তালুকদারের বাড়ি থেকে একটি মানিব্যাগ চুরির অভিযোগ ওঠে শিশু জিসানের বিরুদ্ধে। পরে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে শিশুটির মা নাজমা বেগমও সেখানে যান।
পরিবারের দাবি, সেখানে শিশুটিকে মারধর করা হয়। এ সময় নাজমা বেগম মোবাইল ফোনে ঘটনার একটি ভিডিও ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
‘রক্তের নাতি’ দাবি বিএনপি নেতার
ঘটনার বিষয়ে বিএনপি নেতা ও কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার বলেন, জিসান তাঁর আত্মীয় এবং ‘রক্তের নাতি’। তিনি দাবি করেন, শিশুটির পরিবারের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁরা পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন।
চুন্নু তালুকদারের ভাষ্য, জিসানের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে চুরি করার অভিযোগ এসেছে। ঘটনার রাতে মানিব্যাগ চুরির খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। প্রথমে পুলিশকে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ শিশুটিকে না নেওয়ায় রাগের মাথায় তাকে শাসন করেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, রাগের মাথায় শিশুটিকে মারধর করা ঠিক হয়নি।
চুন্নু তালুকদার বলেন, তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই মিজানকে ফোন করেছিলেন। তবে পুলিশ সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে থানার ডিউটি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল।
পুলিশ বলছে, শিশুকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়নি
কলাপাড়া থানার এএসআই মিজান জানান, ঘটনার রাতে অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার তাঁকে ফোন করেছিলেন। তবে তিনি তখন অন্য একটি দায়িত্বে দূরে অবস্থান করছিলেন। এ কারণে থানার ডিউটি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন।
শিশুটিকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কোনো পরামর্শ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন তিনি।
শিশুর মায়ের অভিযোগ
শিশুটির মা নাজমা বেগমের অভিযোগ, চুরির অভিযোগ তুলে তাঁর ছেলে ও তাঁকে মারধর করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় কৌশলে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে।
নাজমা বেগম বলেন, তাঁর ছেলে বিভিন্ন সময় ছোটখাটো চুরির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিল এবং এ কারণে তিনি মাঝেমধ্যে তাকে শাসন করতেন। তবে ওই রাতে চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে যেভাবে তাদের সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে, তা তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। পাশাপাশি তাঁদের পারিবারিক জমি-সংক্রান্ত কাগজপত্র ফেরত দেওয়ার দাবিও জানান।
মানিব্যাগ নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে আবদুল হাই তালুকদার বলেন, জিসানকে তাঁদের বাড়িতে আনার পর শিশুটির মা মানিব্যাগ ও কিছু কাগজপত্র ফেরত দেন। তাঁর দাবি, মানিব্যাগে টাকা ছিল, তবে পুরো টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, জিসানের বাবার সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল এবং জমি নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।
অন্যদিকে জিসানের দাবি, সে মানিব্যাগ চুরি করেনি। তার ভাষ্য, একটি খালি মানিব্যাগ পেয়েছিল, তবে তাতে কোনো টাকা ছিল না।
স্থানীয়দের কাছ থেকে মিশ্র বক্তব্য
ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে কেউ কেউ শিশুটির বিরুদ্ধে অতীতে চুরির অভিযোগ থাকার কথা জানান। স্থানীয় দোকানি রাসেল দাবি করেন, তাঁর পরিবারের একটি অনুষ্ঠানের সময় দোকান থেকে কিছু মালামাল চুরি হয়েছিল এবং তিনি এ ঘটনায় জিসানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মুজাফফর গাজীও শিশুটির বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। শিশুটির বিরুদ্ধে অতীতে কোনো মামলা বা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্তের স্ত্রী যা বললেন
চুন্নু তালুকদারের স্ত্রী নাজমুন নাহার দাবি করেন, জিসানের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তাঁরা বিভিন্ন সময়ে পরিবারটির সহযোগিতা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, জিসান বিভিন্ন সময় তাঁদের বাড়ির বাগান ও পুকুর থেকে জিনিসপত্র নেওয়ার ঘটনায় জড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনার রাতে তাঁর স্বামী শিশুটিকে শাসন করতে গিয়ে কয়েকবার আঘাত করেন। পরে তিনি বাধা দেন। তবে শিশুটির ওপর এমন আচরণ করা ঠিক হয়নি বলেও তিনি জানান।
তদন্তের কথা জানিয়েছে পুলিশ
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে পুলিশ অবগত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে শিশু জিসান ও তার মা নাজমা বেগমের চিকিৎসা চলছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, চিকিৎসা নথি এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মতামত