স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে আসছিলেন পটুয়াখালীর মহিপুর থানার কচ্ছপখালী এলাকার রেখা বেগম। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বামী আবু বকর প্রায় আড়াই বছর আগে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। নিত্যদিনের খাবার জোগাড় থেকে সংসারের অন্যান্য খরচ—সবকিছুই হয়ে ওঠে কঠিন।
এমন বাস্তবতায় রেখা বেগমের পাশে দাঁড়িয়েছে ডু সামথিং ফাউন্ডেশন। সাময়িক সহায়তার বদলে তাঁকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পাঁচটি ছাগল। এই পাঁচ ছাগলকে ঘিরেই এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তিন সন্তানের মা রেখা বেগম।
ফাউন্ডেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, ছাগল পালন করে একদিকে যেমন ভবিষ্যতে আয় করার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ছাগলের বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে ধীরে ধীরে সম্পদও গড়ে উঠতে পারে। ফলে সময়ের সঙ্গে এটি রেখা বেগমের পরিবারের একটি স্থায়ী আয়ের উৎস হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁদের।
রেখা বেগমের স্বামী আবু বকর রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে রেখা বেগমের ওপর। স্থায়ী কোনো আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় তিন সন্তানকে নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছিল তাঁকে।
রেখা বেগম বলেন, ‘তিন সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলাম। পাঁচটি ছাগল পেয়ে আমি খুব খুশি। যারা আমাকে এই ছাগলগুলো দিয়েছেন, তাঁদের জন্য সারাজীবন দোয়া করব।’
তিনি বলেন, ছাগলগুলো যত্ন করে পালন করতে চান। ভবিষ্যতে এগুলো থেকে আরও ছাগল হবে এবং সেগুলো বিক্রি করে সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের প্রয়োজন মেটাতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা তাঁর।
রেখা বেগমের প্রতিবেশী মেহেদী হাসান বলেন, তাঁর স্বামী ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর রেখা বেগম ও তাঁর সন্তানরা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। পরিবারের তেমন কোনো আয়ের ব্যবস্থা ছিল না। পাঁচটি ছাগল পাওয়ায় আমরা আনন্দিত। আশা করছি, এই সহায়তা তাঁদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
ছাগল বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রেখা বেগম তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। তাঁর অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে পাঁচটি ছাগল উপহার দেওয়া হয়েছে। আশা করি, এর মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন।’
তিনি আরও বলেন, ডু সামথিং ফাউন্ডেশন সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সহায়তা যেন শুধু সাময়িক স্বস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মানুষের জন্য স্থায়ী আয়ের সুযোগ তৈরি করে—সেই লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেখা বেগমের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ‘আমরা কলাপাড়াবাসী’ সংগঠনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, অসহায় একটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এ মানবিক উদ্যোগের জন্য ডু সামথিং ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমন্বয়কারী মো. জাহিদুল ইসলামকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, একটি অসহায় পরিবারের হাতে এমন সম্পদ তুলে দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাদের আয়ের উৎস হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে মানবিকতার দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকেও অসহায় মানুষের পাশে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে ডু সামথিং ফাউন্ডেশন। অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আয়বর্ধক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেও কাজ করছে সংগঠনটি।
স্বামীকে হারানোর পর তিন সন্তানকে নিয়ে যে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছিল রেখা বেগমের, পাঁচটি ছাগল সেই জীবনে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। এখন তাঁর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন—ছাগলগুলো লালন-পালন করে সংখ্যা বাড়ানো, সেগুলো থেকে আয় করা এবং সেই আয়ে সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের প্রয়োজন মেটানো। পাঁচটি ছাগল থেকেই একদিন পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি হবে—এমন আশাতেই নতুন করে পথ চলা শুরু করেছেন রেখা বেগম।
মতামত