ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। নদীতে জাল ফেলছেন জেলেরা, কিন্তু প্রত্যাশিত ইলিশের দেখা মিলছে না। পটুয়াখালীর বাউফলের তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে মাছের সংকটে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ইলিশনির্ভর হাজারো জেলে। বিশেষ করে তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম এলাকাতেও আশানুরূপ ইলিশ না মেলায় তাদের আয়-রোজগারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
বাউফলের তেঁতুলিয়াপাড়ের চরবেরেট গ্রামের জেলে আখের আলী খাঁ (৫৫)। ছেলে সোহেলকে (২০) সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ শিকার করে আসছেন তিনি। ইলিশের মৌসুম শুরুর আগে নৌকা ও জাল কেনা এবং মেরামতের জন্য ঋণ নেন। মৌসুমে মাছ বিক্রির আয় দিয়ে সেই ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালান।
তবে এবারের মৌসুমে সেই হিসাব যেন মিলছে না। নদীর কোথায় ইলিশ পাওয়া যায়, অভিজ্ঞতার কারণে তা ভালোভাবেই জানেন আখের আলী। কিন্তু পরিচিত মাছ ধরার জায়গাগুলোতে বারবার জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না।
আখের আলী বলেন, তাঁদের এলাকায় ইলিশের অভয়াশ্রম থাকলেও এবার নদীতে মাছের পরিমাণ খুবই কম। মৌসুমের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় তিনি ঋণ পরিশোধ ও সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। এনজিওর ঋণের পাশাপাশি মহাজনের কাছ থেকেও দাদন নেওয়া রয়েছে বলে জানান তিনি।
শুধু আখের আলী নন, একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন বাউফলের ইলিশনির্ভর অধিকাংশ জেলে। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, ভরা মৌসুমেও নদীর বিভিন্ন এলাকায় জাল ফেললে আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। তেঁতুলিয়া নদীর দীর্ঘ অভয়াশ্রম এলাকাতেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
প্রতিবছর সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণের মৌসুম চলে। এ সময় পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার হাজারো জেলে ইলিশ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মৌসুমের শুরুতেই নৌকা, জাল, জ্বালানি ও অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য অনেকে ধারদেনা করেন। পরে মাছ বিক্রির আয় থেকে সেই অর্থ পরিশোধ করেন। এবার মাছ কম পাওয়ায় সেই চক্রে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে বাউফলে ইলিশ আহরিত হয়েছে ৫১১ মেট্রিক টন। গত মৌসুমের একই সময়ে আহরণ হয়েছিল ৮৮৩ দশমিক ২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমের প্রথম দুই মাসে ইলিশ আহরণ কমেছে ৩৭২ দশমিক ২ মেট্রিক টন।
বর্তমানে বাউফল উপজেলায় নিবন্ধিত ইলিশনির্ভর জেলের সংখ্যা ৫ হাজার ৫২১ জন। তাঁদের বড় একটি অংশের পরিবারের আয়-রোজগার সরাসরি ইলিশ আহরণের ওপর নির্ভরশীল।
জেলেরা বলছেন, মৌসুমের বাকি সময়ে নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য দেখা দিলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে মাছের সংকট অব্যাহত থাকলে ঋণের বোঝা বাড়ার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় জেলেদের দাবি, তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেলেদের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মতামত