মাউশির তদন্তে অনিয়মের তথ্য, অডিট আপত্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০ লাখ টাকা সরকারি ক্ষতির শঙ্কা
পটুয়াখালীর দশমিনা সরকারি আব্দুর রশিদ তালুকদার কলেজে রেজুলেশন জালিয়াতির মাধ্যমে পদোন্নতি গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে কারিগরি শাখার ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক মো. আনিচুর রহমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, কলেজের বেসরকারি আমলের রেজুলেশনের স্বাক্ষর জাল করে তৈরি করা ডুপ্লিকেট নথির ভিত্তিতে ২০১৯ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নেন তিনি। এরপর থেকে প্রায় আট বছর ধরে ওই পদের বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছেন। বিষয়টি নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তদন্তে পদোন্নতিসংক্রান্ত অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্তের পর অভিযুক্ত শিক্ষকের বেতন প্রভাষক পদ অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক-কর্মচারীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এ ঘটনায় সরকারের প্রায় ২০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ জুন কলেজের বেসরকারি আমলের সর্বশেষ রেজুলেশনের স্বাক্ষর জাল করে একটি ডুপ্লিকেট রেজুলেশন তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই নথির ভিত্তিতে ২০১৯ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান শিক্ষক মো. আনিচুর রহমান। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্তে পদোন্নতিসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতিতে সহযোগিতার অভিযোগে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ দুই শিক্ষককে তিন মাসের 'স্টপ পেমেন্ট' শাস্তি দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে আনিচুর রহমানের বেতন প্রভাষক পদ অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ এবং সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, মাউশির ২০২৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির তদন্তসংশ্লিষ্ট স্মারক এবং একই বছরের ২৮ ডিসেম্বরের নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ ফেরত নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট কলেজে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের অডিট কার্যক্রমেও বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারির অডিট প্রতিবেদন এবং ১২ জুলাই পুনরায় পাঠানো নির্দেশনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বেতন প্রভাষক পদে নির্ধারণ ও অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়ে জোর তাগিদ দেওয়া হয়।
কলেজের প্রভাষক মো. মাহমুদুল্লাহ বলেন, “২০১৯ সালেই রেজুলেশনসংক্রান্ত অনিয়ম ধরা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে এবং দুদক ও মাউশির তদন্তেও পদোন্নতির অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে অর্থ ফেরতের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আমিনুল হক বলেন, “বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির বিষয়টি নিষ্পত্তি করে প্রভাষক পদে বেতন নির্ধারণ এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ ফেরতের নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক মো. আনিচুর রহমান। তিনি বলেন, “আমি পদোন্নতির সব যোগ্যতা অর্জনের পরই আবেদন করেছি এবং কর্তৃপক্ষ আমাকে বৈধভাবে পদোন্নতি দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমার কাগজপত্র যাচাই করে কোনো অনিয়ম পায়নি।”
কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক গাজী সবুজ আহমেদ বলেন, “মাউশির তদন্তের পর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেও বিষয়টি পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে বিধি অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে মর্মে চিঠি পাওয়া গেছে। অডিট আপত্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক জবাব দিয়ে তা নিষ্পত্তি করতে পারবেন। অন্যথায় বিষয়টি মহাপরিচালককে জানানো হবে।”
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই, কারণ আমি নতুন যোগদান করেছি। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জানাতে পারব।”
অন্যদিকে, তদন্ত ও অডিট আপত্তির পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে। তাঁদের দাবি, বিষয়টি আর দীর্ঘসূত্রতায় না রেখে সংশ্লিষ্ট সব নথি পর্যালোচনা করে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী বেতন পুনর্নির্ধারণ, অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত এবং অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মতামত