পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মহিপুর-আলীপুরে অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে তীব্র বরফ সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বরফ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে বরফের দাম দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে, অন্যদিকে বরফ সংকটে অন্তত ৫০০ মাছধরা ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যে এক ক্যান বরফ ১৫০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এরপরও প্রয়োজন অনুযায়ী বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। ইলিশের ভরা মৌসুমে গত এক সপ্তাহ ধরে বরফের সংকটে অনেক ট্রলার সাগরে যেতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তারা মৎস্যবন্দরগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
কুয়াকাটার গঙ্গামতি এলাকার জেলে আলী মাঝি বলেন, “আগে বিদ্যুৎ ভালো ছিল। এখন প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকে না। বরফও কম তৈরি হচ্ছে। ১৫০ টাকার এক ক্যান বরফ এখন ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাও প্রয়োজনমতো পাওয়া যাচ্ছে না।”
ট্রলার মালিক সুমন মিয়া বলেন, “সাগরে তেমন মাছ পড়ছে না, তারপরও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সাগরে যেতে হয়। কিন্তু বরফের অভাবে যেতে পারছি না। জেলেরা ঘাটে বসে আছে, আর ট্রলার মালিকদের প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
মহিপুর গাজী আইচ প্লান্টের স্বত্বাধিকারী মো. মজনু গাজী বলেন, “২৪ ঘণ্টায় গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তাও ২-৩ ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসে-যায়। এতে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে বরফ উৎপাদন করতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। ফলে বরফের দামও বেড়েছে। জেলেদের চাহিদার এক-চতুর্থাংশ বরফও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।”
মহিপুর মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি ও মহিপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী বলেন, “বরফ সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। বরফ না পাওয়ায় জেলেরা ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে পারছেন না। ফলে বন্দরে মাছও আসছে না। এভাবে চলতে থাকলে এ বছর মৎস্য খাতে কোটি কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।”
কলাপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জোনাল ম্যানেজার আব্দুর রহমান বলেন, “কলাপাড়ায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৫ মেগাওয়াট। সেখানে চাহিদার ৪০ শতাংশও পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি, পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল ও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার আলোচনা করা হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।”
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, “বিদ্যুতের সমস্যা সারা দেশেই রয়েছে। তারপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছি, মৎস্যবন্দরে আপাতত বিকল্পভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা দেখা হচ্ছে। বরফের দাম কিছুটা বেড়েছে। এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, “বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বরফ উৎপাদনে সমস্যা হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএমের সঙ্গে আলোচনা করে মৎস্যবন্দরের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা চেষ্টা করছি। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর দিয়ে বরফ উৎপাদন করতে হচ্ছে, ফলে দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে এ সুযোগে কেউ যেন অতিরিক্ত দাম নিতে না পারে, সে বিষয়টিও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।”
ইলিশের মৌসুমে বরফ সংকট দ্রুত সমাধান না হলে জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশের মৎস্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মতামত