মহালয়ার ধর্মীয় আবহে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পিতৃতর্পণ ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতীক্ষা। প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা এবং দেবী দুর্গার আগমনী বন্দনার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করেন পুণ্যার্থীরা। চণ্ডীপাঠের মন্ত্রধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে কুয়াকাটা শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির ও তীর্থযাত্রী সেবাশ্রম প্রাঙ্গণ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৫টায় মন্দির ও সেবাশ্রমে পিতৃতর্পণযজ্ঞ শুরু হয়। এতে মাদারীপুর থেকে আসা শতাধিক পুণ্যার্থী অংশ নেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ফুল ও অন্যান্য উপকরণ নিবেদন এবং প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তাঁরা মহালয়ার আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এদিন প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় পিতৃতর্পণ করা হয়। একই সঙ্গে চণ্ডীপাঠ ও প্রার্থনার মাধ্যমে দেবী দুর্গার আবাহন করা হয়। মহালয়াকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে শুরু হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ও অপেক্ষা।
মাদারীপুর থেকে পিতৃতর্পণ করতে আসা শ্রী বিভাস ঘোষ বলেন, দেবতা, ঋষি ও পিতৃপুরুষদের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ফুল, তুলসী, তিল ও খাদ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে তাঁরা তর্পণ করেছেন। এ বিশেষ দিনে দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, পৃথিবী থেকে সব অশুভ শক্তি, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর হোক। সবাই যেন শান্তিপূর্ণ সমাজে বসবাস করতে পারেন।
মহালয়ার ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরে বরিশাল মুরারী সেবা ট্রাস্টের পুরোহিত পণ্ডিত প্রেমসচী গোস্বামী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহালয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিনের মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয় এবং মা দুর্গার আগমনী বার্তা পাওয়া যায়। চণ্ডীপাঠ, পূজা-অর্চনা ও প্রার্থনার মাধ্যমে দেবীর কাছে সবার মঙ্গল কামনা করা হয়।
তিনি বলেন, মহালয়া শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জাগরণেরও প্রতীক। দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের প্রত্যাশা করেন।
কুয়াকাটা শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির ও তীর্থযাত্রী সেবাশ্রমের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নীহার রঞ্জন মণ্ডল বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা সন্তানদের নিয়ে কৈলাস থেকে মর্ত্যলোকে আগমনের যাত্রা শুরু করেন। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, এবার দেবীর আগমন ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়। এর প্রতীকী ব্যাখ্যায় ধরিত্রী শস্যশ্যামলা হওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং সুফলা ফসলের প্রত্যাশা করা হয়।
তিনি আরও জানান, আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।
এদিকে মহালয়াকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটায় আগত পর্যটক ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। সৈকতসহ পর্যটকদের সমাগমস্থলগুলোতে নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক নাজমুল হাসান।
তিনি বলেন, পর্যটকেরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের সচেতন থাকার এবং যেকোনো সমস্যায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে মহালয়াকে ঘিরে কুয়াকাটায় তৈরি হয়েছে ধর্মীয় আবহ ও উৎসবের আমেজ। পিতৃপুরুষের স্মরণ, প্রার্থনা ও দেবী দুর্গার আগমনী বন্দনার মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখন অপেক্ষা করছেন শারদীয় দুর্গোৎসবের।
মতামত