ঢাকা    সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩
পটুয়াখালী টুডে

মুঠোফোনের ক্যামেরায় উপকূলের গল্প, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাঙ্গাবালীর শাহরিয়ার নাবিলের



মুঠোফোনের ক্যামেরায় উপকূলের গল্প, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাঙ্গাবালীর শাহরিয়ার নাবিলের
মুঠোফোনের ক্যামেরায় উপকূলের গল্প, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাঙ্গাবালীর শাহরিয়ার নাবিলের

‘জীবিকার তাগিদে মৎস্য শিকার’ ছবিতে Commonwealth Youth Photography Competition-এ ‘Highly Commended Award’

নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালী:
দামি ক্যামেরা নেই, নেই পেশাদার আলোকচিত্রের সরঞ্জাম। একটি মুঠোফোনের ক্যামেরা আর চারপাশের সাধারণ দৃশ্যের ভেতর গল্প খুঁজে নেওয়ার দৃষ্টিই ছিল তাঁর সম্বল। সেই মুঠোফোনেই পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর উপকূলীয় জনপদের জীবন, মানুষের সংগ্রাম ও সমুদ্রনির্ভর জীবিকার গল্প তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পেয়েছেন তরুণ আলোকচিত্রী শাহরিয়ার নাবিল।

২০২৬ সালের Commonwealth Youth Photography Competition-এ অংশ নিয়ে নাবিলের ‘জীবিকার তাগিদে মৎস্য শিকার’ শিরোনামের আলোকচিত্রটি অর্জন করেছে ‘Highly Commended Award’। ‘Waves of Change’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক এ প্রতিযোগিতায় তাঁর ছবিটি ‘সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের সংযোগ’ ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়।

রাঙ্গাবালীর উপকূল থেকে উঠে আসা নাবিলের এ অর্জন স্থানীয় মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ককে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরারও একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।

শখ থেকে আলোকচিত্রের পথে

শাহরিয়ার নাবিলের আলোকচিত্রের যাত্রা শুরু নিছক শখ থেকে। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার মুঠোফোন দিয়ে ছবি তোলার হাতেখড়ি তাঁর। শুরুতে বাড়ির আশপাশের প্রকৃতি, মানুষ ও দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ দৃশ্যই ছিল তাঁর ছবির বিষয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবির বিষয়েও পরিবর্তন আসে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের জীবন, জীবিকার সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাঁর আলোকচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

পেশাদার ক্যামেরা না থাকায় দীর্ঘ সময় তাঁর তোলা ছবিগুলো সীমাবদ্ধ ছিল মুঠোফোনের গ্যালারিতে। তবে ছবির প্রতি আগ্রহ ও চর্চা থেমে থাকেনি।

প্রদর্শনী থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় ডাকসুর আয়োজনে ‘Beyond The Classroom’ ফটো প্রদর্শনীতে তাঁর একটি ছবি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নাবিলের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়। প্রথমবারের মতো গ্যালারির পরিসরে দর্শকের সামনে আসে তাঁর আলোকচিত্র। এরপর থেকেই আলোকচিত্রকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া শুরু করেন তিনি।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জায়গা করে নেয় তাঁর তোলা ছবি। Royal Commonwealth Society, Commonwealth Secretariat এবং City of London Youth Natural Environment Board-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত Commonwealth Youth Photography Competition-এ কমনওয়েলথভুক্ত ৫৬টি দেশের ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।

এবারের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল ‘Waves of Change’। এতে সমুদ্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, প্রতিকূলতা মোকাবিলায় মানুষের সক্ষমতা এবং সমুদ্র রক্ষায় স্থানীয় উদ্যোগের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

নাবিলের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিতেও উঠে এসেছে উপকূলের মানুষের বাস্তব জীবন। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন সমুদ্রের ওপর নির্ভর করে চলা জেলেদের সংগ্রামকে একটি মাত্র ফ্রেমে ধারণ করেছেন তিনি।

‘দৃশ্যের ভেতর গল্প খুঁজি’

নিজের আলোকচিত্রের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শাহরিয়ার নাবিল বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বিষয় ও দৃশ্য ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করার শখ ছিল। ১০ বছর বয়সে বাবার মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা শুরু করি। পরে মানুষের জীবনসংগ্রামকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি যখন কোথাও ঘুরতে যাই, তখন ছবি তোলার জন্য সাবজেক্ট খুঁজে বেড়াই। চেষ্টা করি কোনো দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দী করে রাখতে, যাতে পরবর্তীতে সেটি অন্যদের দেখানোর সুযোগ হয়।”

আলোকচিত্রের পাশাপাশি পড়াশোনা ও প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন নাবিল। বর্তমানে তিনি নিজের স্টার্টআপ ‘Farmly AI’ নিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি Climate Changemaker হিসেবে বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিচ্ছেন।

রাঙ্গাবালীর প্রত্যন্ত উপকূল থেকে শুরু হওয়া শাহরিয়ার নাবিলের এই যাত্রা দেখিয়েছে, একটি শক্তিশালী গল্প তুলে ধরতে সবসময় অত্যাধুনিক ক্যামেরা কিংবা ব্যয়বহুল সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। চারপাশকে নতুনভাবে দেখার চোখ, মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে অনুভব করার সক্ষমতা এবং সেই মুহূর্তকে যথাযথভাবে ধারণ করার দক্ষতাই একজন আলোকচিত্রীকে আলাদা করে তুলতে পারে।

নাবিলের আন্তর্জাতিক এ স্বীকৃতি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদ ও সেখানকার মানুষের জীবনসংগ্রামকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

পটুয়াখালী টুডে

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬


মুঠোফোনের ক্যামেরায় উপকূলের গল্প, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাঙ্গাবালীর শাহরিয়ার নাবিলের

প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

‘জীবিকার তাগিদে মৎস্য শিকার’ ছবিতে Commonwealth Youth Photography Competition-এ ‘Highly Commended Award’

নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালী:
দামি ক্যামেরা নেই, নেই পেশাদার আলোকচিত্রের সরঞ্জাম। একটি মুঠোফোনের ক্যামেরা আর চারপাশের সাধারণ দৃশ্যের ভেতর গল্প খুঁজে নেওয়ার দৃষ্টিই ছিল তাঁর সম্বল। সেই মুঠোফোনেই পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর উপকূলীয় জনপদের জীবন, মানুষের সংগ্রাম ও সমুদ্রনির্ভর জীবিকার গল্প তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পেয়েছেন তরুণ আলোকচিত্রী শাহরিয়ার নাবিল।

২০২৬ সালের Commonwealth Youth Photography Competition-এ অংশ নিয়ে নাবিলের ‘জীবিকার তাগিদে মৎস্য শিকার’ শিরোনামের আলোকচিত্রটি অর্জন করেছে ‘Highly Commended Award’। ‘Waves of Change’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক এ প্রতিযোগিতায় তাঁর ছবিটি ‘সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের সংযোগ’ ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়।

রাঙ্গাবালীর উপকূল থেকে উঠে আসা নাবিলের এ অর্জন স্থানীয় মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ককে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরারও একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।

শখ থেকে আলোকচিত্রের পথে

শাহরিয়ার নাবিলের আলোকচিত্রের যাত্রা শুরু নিছক শখ থেকে। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার মুঠোফোন দিয়ে ছবি তোলার হাতেখড়ি তাঁর। শুরুতে বাড়ির আশপাশের প্রকৃতি, মানুষ ও দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ দৃশ্যই ছিল তাঁর ছবির বিষয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবির বিষয়েও পরিবর্তন আসে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের জীবন, জীবিকার সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাঁর আলোকচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

পেশাদার ক্যামেরা না থাকায় দীর্ঘ সময় তাঁর তোলা ছবিগুলো সীমাবদ্ধ ছিল মুঠোফোনের গ্যালারিতে। তবে ছবির প্রতি আগ্রহ ও চর্চা থেমে থাকেনি।

প্রদর্শনী থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় ডাকসুর আয়োজনে ‘Beyond The Classroom’ ফটো প্রদর্শনীতে তাঁর একটি ছবি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নাবিলের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়। প্রথমবারের মতো গ্যালারির পরিসরে দর্শকের সামনে আসে তাঁর আলোকচিত্র। এরপর থেকেই আলোকচিত্রকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া শুরু করেন তিনি।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জায়গা করে নেয় তাঁর তোলা ছবি। Royal Commonwealth Society, Commonwealth Secretariat এবং City of London Youth Natural Environment Board-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত Commonwealth Youth Photography Competition-এ কমনওয়েলথভুক্ত ৫৬টি দেশের ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।

এবারের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল ‘Waves of Change’। এতে সমুদ্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, প্রতিকূলতা মোকাবিলায় মানুষের সক্ষমতা এবং সমুদ্র রক্ষায় স্থানীয় উদ্যোগের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

নাবিলের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিতেও উঠে এসেছে উপকূলের মানুষের বাস্তব জীবন। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন সমুদ্রের ওপর নির্ভর করে চলা জেলেদের সংগ্রামকে একটি মাত্র ফ্রেমে ধারণ করেছেন তিনি।

‘দৃশ্যের ভেতর গল্প খুঁজি’

নিজের আলোকচিত্রের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শাহরিয়ার নাবিল বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বিষয় ও দৃশ্য ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করার শখ ছিল। ১০ বছর বয়সে বাবার মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা শুরু করি। পরে মানুষের জীবনসংগ্রামকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি যখন কোথাও ঘুরতে যাই, তখন ছবি তোলার জন্য সাবজেক্ট খুঁজে বেড়াই। চেষ্টা করি কোনো দৃশ্যকে ক্যামেরাবন্দী করে রাখতে, যাতে পরবর্তীতে সেটি অন্যদের দেখানোর সুযোগ হয়।”

আলোকচিত্রের পাশাপাশি পড়াশোনা ও প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন নাবিল। বর্তমানে তিনি নিজের স্টার্টআপ ‘Farmly AI’ নিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি Climate Changemaker হিসেবে বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিচ্ছেন।

রাঙ্গাবালীর প্রত্যন্ত উপকূল থেকে শুরু হওয়া শাহরিয়ার নাবিলের এই যাত্রা দেখিয়েছে, একটি শক্তিশালী গল্প তুলে ধরতে সবসময় অত্যাধুনিক ক্যামেরা কিংবা ব্যয়বহুল সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। চারপাশকে নতুনভাবে দেখার চোখ, মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে অনুভব করার সক্ষমতা এবং সেই মুহূর্তকে যথাযথভাবে ধারণ করার দক্ষতাই একজন আলোকচিত্রীকে আলাদা করে তুলতে পারে।

নাবিলের আন্তর্জাতিক এ স্বীকৃতি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদ ও সেখানকার মানুষের জীবনসংগ্রামকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।


পটুয়াখালী টুডে

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান: মোঃ আতিকুল ইসলাম
ভাইস চেয়ারম্যান: মোঃ জাকারিয়া হোসেন
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: আব্দুর রহিম মেহেদী
বার্তা সম্পাদক: মোঃ মাসুদ খান

কপিরাইট © ২০২৬ পটুয়াখালী টুডে । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মুঠোফোনের ক্যামেরায় উপকূলের গল্প, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাঙ্গাবালীর শাহরিয়ার নাবিলের
0:00 0:00
1.0x