কোলাহলময় এই পৃথিবীতে একজন মানুষ যখন জীবনের নানা বাঁকে দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন তার জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয় হতে পারে এমন একটি পথনির্দেশনা, যা প্রতিকূলতার মধ্যেও সঠিক পথের সন্ধান দেয়। পবিত্র কোরআনের দীর্ঘতম অধ্যায় ‘সুরা আল-বাকারাহ’ তেমনই এক বিস্তৃত দিকনির্দেশনা। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অধ্যায় নয়; মানুষের মন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
মদিনায় অবতীর্ণ এই সুরার বিভিন্ন শিক্ষা থেকে দৈনন্দিন জীবনের জন্য ১০টি গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন তুলে ধরা যায়। এসব শিক্ষা মানুষের চিন্তা, আচরণ ও জীবনযাপনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
১. তাকওয়া: সঠিক পথ চেনার অন্তরের নির্দেশনা
জীবনের নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে ‘তাকওয়া’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্রষ্টার প্রতি ভয় ও ভালোবাসা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থিরতা আনতে পারে। কোরআনের হেদায়াত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাকওয়াবানদের বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘এ সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকিদের (তাকওয়াবানদের) জন্য পথপ্রদর্শক।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ২
২. শয়তানের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকা এবং তওবার গুরুত্ব
অন্যায় অনেক সময় হঠাৎ করে মানুষের জীবনে আসে না; ছোট ছোট প্রলোভনের মধ্য দিয়েই মানুষ ধীরে ধীরে ভুল পথে পা বাড়াতে পারে। তাই শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলের পর অহংকারে অটল না থেকে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার শিক্ষা রয়েছে।
‘হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ১৬৮
৩. বিপদের সময়ে ধৈর্য ও সালাতের আশ্রয়
জীবনের কঠিন সময় মানুষকে অনেক সময় দিশেহারা করে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ এবং সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। বিপদ যত বড়ই হোক, ধৈর্য ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ১৫৩
৪. ক্ষতি ও শোকের সময়ে পরম প্রত্যাবর্তনের বিশ্বাস
প্রিয়জন হারানো কিংবা সম্পদের ক্ষতির মতো ঘটনায় মানুষের মনে গভীর কষ্ট তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে দুনিয়ার সবকিছুই যে ক্ষণস্থায়ী এবং মানুষকে শেষ পর্যন্ত স্রষ্টার কাছেই ফিরে যেতে হবে—এই বিশ্বাস মানুষকে শোক মোকাবিলায় শক্তি জোগাতে পারে।
‘তারা কোনো বিপদে পতিত হলে বলে : নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবেই আমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ১৫৬
৫. সম্পর্কের মর্যাদা ও বিচ্ছেদের সময়েও সৌজন্য
দাম্পত্য সম্পর্ক ভালোবাসার বন্ধনে গড়ে ওঠে। তবে কোনো কারণে সেই সম্পর্কের অবসান ঘটলেও পারস্পরিক সম্মান ও সৌজন্য বিসর্জন দেওয়ার সুযোগ নেই। বিচ্ছেদের মতো কঠিন সময়েও একে অপরের প্রতি উদারতা ও সহানুভূতি বজায় রাখার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সৌজন্যের কথা ভুলে যেও না।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ২৩৭
৬. সুদ বর্জন ও শোষণমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
অসহায়ত্ব ও অভাবকে কাজে লাগিয়ে অন্যের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না। সুদকে বর্জন করে করজে হাসানা ও দানের মাধ্যমে মানবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সম্পদ যেন কেবল অর্থশালীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই দিকটিও এখানে উঠে এসেছে।
‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ২৭৫
৭. আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও লিখিত হিসাব
পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি বিশ্বাস হলেও অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ কিংবা অন্যায়ের সুযোগ এড়াতে নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ বা দেনাপাওনা লিখে রাখার এবং সাক্ষী রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘হে মুমিনরা! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পরের মধ্যে ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ২৮২
৮. বিশ্বাসের ক্ষেত্রে জবরদস্তির সুযোগ নেই
ধর্ম মানুষের অন্তরের বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভয়, লোভ বা জোর প্রয়োগ করে কাউকে সত্যের অনুসারী বানানো যায় না। সত্য ও ভ্রান্ত পথের পার্থক্য স্পষ্ট হওয়ার পর মানুষ নিজের বিবেক দিয়ে পথ বেছে নেবে—এমন স্বাধীনতার কথাই এখানে বলা হয়েছে।
‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা জোরজবরদস্তি নেই; সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ২৫৬
৯. আত্মসংযম ও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা
শুধু শারীরিক শক্তি দিয়ে প্রকৃত বীরত্বের পরিচয় দেওয়া যায় না। নিজের রাগ, আবেগ ও ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করাও আত্মসংযমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যের ভুলের জবাবে ক্ষমাশীল হওয়া এবং নিজের ক্রোধ সংবরণ করার মধ্যেও মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।
‘তোমরা সৎকাজ করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ১৯৫
১০. সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব না চাপানো এবং আল্লাহর করুণা
সুরা আল-বাকারাহর শেষাংশে মানুষের জন্য রয়েছে স্বস্তি ও আশ্বাসের বার্তা। আল্লাহ কোনো বান্দার ওপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। একই সঙ্গে মানবীয় দুর্বলতা ও ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার একটি আকুল দোয়ার ভাষাও এখানে শেখানো হয়েছে।
‘আল্লাহ কারো ওপর এমন কোনো কষ্টের বোঝা চাপিয়ে দেন না, যা তার সাধ্যের বাইরে।’
—সুরা আল-বাকারাহ : ২৮৬
সুরা আল-বাকারাহ তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনের নানা পরিস্থিতিতে এটি দিকনির্দেশনার উৎস হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। দৈনন্দিন চিন্তা, আচরণ, সামাজিক ও আর্থিক লেনদেন এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির ক্ষেত্রে এই সুরার শিক্ষাগুলো অনুসরণ করলে জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মিক প্রশান্তি ধরে রাখার পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
সূত্র: আমার দেশ
মতামত