পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ও বাউফল রক্ষাচণ্ডী মন্দিরের সহসভাপতি সমীর বণিক (৩৭) নিখোঁজ হওয়ার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো তার সন্ধান মেলেনি। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসে ওঠার পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একমাত্র স্বজনের সন্ধান না পাওয়ায় উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
সমীর বণিকের নিখোঁজের খবর জানতে পেরে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বুধবার (১ অক্টোবর) ভিডিও কলে সমীর বণিকের মা, ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের খোঁজখবর নেন তিনি এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
এ সময় ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “সমীর বণিক আমাদের বাউফলের একজন বাসিন্দা। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে একজন মানুষ হিসেবে তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং তার সার্বিক খোঁজখবর রাখার বিষয়ে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তিনি আরও জানান, সমীর বণিককে খুঁজে বের করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাকে দ্রুত উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে বগা ফেরিঘাট থেকে ‘দশমিনা ট্রাভেলস’ নামে একটি বাসে ওঠেন সমীর বণিক। বাসে ওঠার কয়েক ঘণ্টা পর রাত ২টার দিকে তার বোন পূজার মোবাইল ফোনে ‘কিরে ঘুমাইছো?’ লেখা একটি বার্তা পাঠান তিনি। পরদিন বিকেলেও পরিবারের সঙ্গে তার কথা হয়। তখন তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে জানান। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এ ঘটনায় সমীর বণিকের ভাই সঞ্জিব বণিক বাউফল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
স্থানীয়ভাবে পরিচিত ব্যবসায়ী সমীর বণিক বগা বন্দরের ব্যবসায়ী মহলে সুপরিচিত। বগা বন্দর ও লঞ্চঘাট এলাকায় ‘লোকনাথ ভান্ডার’সহ তার কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী কামরুল ইসলাম জানান, ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে সমীর বণিককে একজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখেছিলেন তিনি। ওই সময় তাকে বলতে শোনা যায়, “আপনি ওখানে থাইকেন, আমি আসতেছি।” তবে ওই ব্যক্তি কে ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি বা পরিবার নিশ্চিত নন।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত সহায়তায় সমীর বণিকের মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান সাতক্ষীরায় শনাক্ত হয়েছিল। এরপর তার আর কোনো অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
সমীর বণিকের ভাই সঞ্জিব বণিক জানান, তার ভাই ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত পণ্য কিনতেন। ওই প্রতিষ্ঠানে তার প্রায় পাঁচ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া ছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে এ অর্থের সঙ্গে সমীর বণিকের নিখোঁজ হওয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
সমীর বণিকের দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাউফল সার্বজনীন কেন্দ্রীয় কালিমন্দিরের সভাপতি জীবন কৃষ্ণ সাহা বলেন, “সমীর বণিক একজন ব্যবসায়ী এবং রক্ষাচণ্ডী মন্দিরের সহসভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দ্রুত তার সন্ধান নিশ্চিত করা হোক।”
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাউফল উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দও সমীর বণিকের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।
সমীর বণিকের সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বাউফল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, নিখোঁজ ব্যবসায়ীকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা চলছে। দেশের বিভিন্ন থানায় তথ্য পাঠানোসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় দ্রুত সমীর বণিকের সন্ধান মিলবে এবং দীর্ঘ ১২ দিনের উৎকণ্ঠার অবসান হবে।
মতামত