পটুয়াখালীতে ইয়াবা সরবরাহের কথা বলে নেওয়া ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা ফেরত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে অটোরিকশাচালক জাকারিয়া (২৮)-কে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যার পর তাঁর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে অটোরিকশা থেকে খুলে নেওয়া তিনটি ব্যাটারি বিক্রি করে দেয় হত্যায় জড়িতরা।
ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে নিহতের অটোরিকশা এবং বিক্রি করা তিনটি ব্যাটারি।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পটুয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মো. সাইফুল ইসলাম (২৯), তাঁর সহযোগী মো. মামুন হাওলাদার (২৯) এবং চোরাই ব্যাটারি ক্রেতা মো. শুক্কুর আকন (৪৫)।
যেভাবে সামনে আসে হত্যার রহস্য
পুলিশ জানায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন জাকারিয়া। কিন্তু সেদিন আর তিনি বাড়ি ফেরেননি। পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর সকালে পটুয়াখালীর জৈনকাঠী ইউনিয়নের লোহালিয়া নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. রুহুল আমিন শরীফ বাদী হয়ে পটুয়াখালী সদর থানায় হত্যা, চুরি ও আলামত গোপনের অভিযোগে মামলা করেন।
মামলার তদন্তে জেলা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, সিআইডি ও পিবিআইয়ের একাধিক দল কাজ শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে গাজীপুর থেকে সাইফুল ইসলাম, পটুয়াখালী থেকে মামুন হাওলাদার এবং মহিপুর এলাকা থেকে শুক্কুর আকনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
টাকা ফেরত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জাকারিয়া ও সাইফুল আগে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইয়াবা সরবরাহের কথা বলে সাইফুলের কাছ থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেন জাকারিয়া। পরে ইয়াবা সরবরাহ করতে না পারা এবং টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
পুলিশ জানায়, ওই বিরোধের জেরেই জাকারিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করেন সাইফুল। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি মামুনকে সঙ্গে নেন।
তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আসামিদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি অনুযায়ী, গত ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ইয়াবার চালান দেওয়ার কথা বলে জাকারিয়াকে লোহালিয়া নদীর তীরবর্তী জৈনকাঠী খেয়াঘাট এলাকায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে মাদক সেবনের একপর্যায়ে পাওনা টাকা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে সাইফুল সিএনজির তার/ক্যাবল দিয়ে জাকারিয়ার গলায় ফাঁস দেন এবং মামুন তাঁর পা চেপে ধরেন। পরে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ লোহালিয়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
অটোরিকশা নদীতে, ব্যাটারি বিক্রি
হত্যার পর জাকারিয়ার অটোরিকশাটি বিসিক শিল্প এলাকার পাশের নদীর পাড়ে নিয়ে যায় আসামিরা। সেখানে অটোরিকশা থেকে তিনটি ব্যাটারি খুলে নেওয়ার পর অটোরিকশাটিও নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
পরে ওই তিনটি ব্যাটারি মহিপুরের শুক্কুর আকনের কাছে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। বিক্রির টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় হত্যায় জড়িতরা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তের একপর্যায়ে লোহালিয়া নদী থেকে ডুবে থাকা অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে শুক্কুর আকনের কাছ থেকে তিনটি ব্যাটারি জব্দ করা হয়েছে।
তদন্ত এখনো চলছে
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল জানান, এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মতামত