ঢাকা    শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
পটুয়াখালী টুডে

কুয়াকাটা উপকূলে জেলের জালে বিরল ‘স্লেন্ডার সানফিশ’



কুয়াকাটা উপকূলে জেলের জালে বিরল ‘স্লেন্ডার সানফিশ’
কুয়াকাটা উপকূলে জেলের জালে বিরল ‘স্লেন্ডার সানফিশ’

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলসংলগ্ন গভীর বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ‘স্লেন্ডার সানফিশ’। অস্বাভাবিক গড়ন ও চ্যাপ্টা-ডিম্বাকৃতির শরীরের মাছটি নিয়ে কুয়াকাটা ও মহিপুরের জেলে এবং মৎস্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।

রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে মাছটি মহিপুর মৎস্য বন্দরের ‘শাহীন এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি আড়তে আনা হয়। মাছটির ওজন প্রায় ২ কেজি ৭০০ গ্রাম। স্থানীয় বাজারে এ ধরনের মাছ আগে খুব একটা দেখা না যাওয়ায় শুরুতে এর পরিচয় নিয়ে জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। অপরিচিত হওয়ায় মাছটি কিনতেও কোনো ক্রেতা আগ্রহ দেখাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গভীর সাগরে জালে উঠে আসে অদ্ভুত মাছ

স্থানীয় জেলেরা জানান, কুয়াকাটা সংলগ্ন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সময় অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে তাঁদের জালে মাছটি উঠে আসে। মাছটির শরীর সাধারণ মাছের তুলনায় অনেক বেশি চ্যাপ্টা এবং আকৃতি কিছুটা ডিম্বাকৃতির। সুস্পষ্ট লেজ না থাকায় প্রথম দেখায় জেলেরা মাছটির প্রজাতি শনাক্ত করতে পারেননি।

দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করা জেলে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাগরে অনেক বছর ধরে মাছ ধরছি। নানা ধরনের মাছ জালে উঠেছে। কিন্তু এমন আকৃতির মাছ আগে কখনো দেখিনি। দেখতে একেবারেই আলাদা।’

আরেক জেলে আব্দুর রবও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, জালে ওঠার পর মাছটির অস্বাভাবিক আকৃতি দেখে প্রথমে তাঁরা বুঝতে পারেননি এটি কোন প্রজাতির মাছ।

বৈজ্ঞানিক নাম ‘Ranzania laevis’

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক শনাক্তকরণ অনুযায়ী, মাছটি ‘স্লেন্ডার সানফিশ’ নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ranzania laevis। এটি মূলত উন্মুক্ত ও গভীর সমুদ্রের একটি সামুদ্রিক মাছ। দেহের গঠন ও চলন অন্যান্য প্রচলিত সামুদ্রিক মাছের তুলনায় বেশ ভিন্ন।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সানফিশ পরিবারের মাছ বিভিন্ন সময় সমুদ্রের ওপরের স্তরে উঠে আসতে পারে। সমুদ্রের পানির ওপর ভেসে বা সূর্যের আলোতে শরীর উষ্ণ করার আচরণের সঙ্গে ‘সানফিশ’ নামটির সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় এ ধরনের মাছ খুব কম দেখা যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে কুয়াকাটা উপকূলের কাছাকাছি এটির ধরা পড়া সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আগ্রহ তৈরি করতে পারে।

গবেষণার জন্য তথ্য সংরক্ষণের পরামর্শ

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজিব সরকার বলেন, কুয়াকাটা উপকূলে এ ধরনের বিরল সামুদ্রিক মাছ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ। মাছটির ছবি, ওজন, দৈহিক বৈশিষ্ট্য এবং কোথায় ধরা পড়েছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সামুদ্রিক প্রাণীর বিস্তৃতি ও উপস্থিতি নিয়ে গবেষণায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীর বিষয়ে তথ্যভান্ডার তৈরিতেও এসব রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ।

উপকূলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে নতুন তথ্য

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর থেকে বেশ কিছু বিরল ও স্থানীয়ভাবে অপরিচিত সামুদ্রিক মাছ পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব মাছের উপস্থিতি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার জলজ পরিবেশ কতটা বৈচিত্র্যময়, তার একটি ধারণা দেয়।

তিনি আরও বলেন, বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী ধরা পড়লে সম্ভব হলে ছবি, ওজন, অবস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে গবেষণা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে সহায়তা পাওয়া যাবে।

স্থানীয় জেলেরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের মাছ ধরা পড়লেও এমন ব্যতিক্রমী আকৃতির মাছ তাঁদের জালে খুব কমই আসে। ফলে স্লেন্ডার সানফিশটি দেখতে মহিপুর মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বঙ্গোপসাগরের জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে এ ধরনের বিরল প্রজাতির মাছের উপস্থিতি নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

পটুয়াখালী টুডে

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কুয়াকাটা উপকূলে জেলের জালে বিরল ‘স্লেন্ডার সানফিশ’

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলসংলগ্ন গভীর বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ‘স্লেন্ডার সানফিশ’। অস্বাভাবিক গড়ন ও চ্যাপ্টা-ডিম্বাকৃতির শরীরের মাছটি নিয়ে কুয়াকাটা ও মহিপুরের জেলে এবং মৎস্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে কৌতূহল।


রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে মাছটি মহিপুর মৎস্য বন্দরের ‘শাহীন এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি আড়তে আনা হয়। মাছটির ওজন প্রায় ২ কেজি ৭০০ গ্রাম। স্থানীয় বাজারে এ ধরনের মাছ আগে খুব একটা দেখা না যাওয়ায় শুরুতে এর পরিচয় নিয়ে জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। অপরিচিত হওয়ায় মাছটি কিনতেও কোনো ক্রেতা আগ্রহ দেখাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


গভীর সাগরে জালে উঠে আসে অদ্ভুত মাছ


স্থানীয় জেলেরা জানান, কুয়াকাটা সংলগ্ন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সময় অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে তাঁদের জালে মাছটি উঠে আসে। মাছটির শরীর সাধারণ মাছের তুলনায় অনেক বেশি চ্যাপ্টা এবং আকৃতি কিছুটা ডিম্বাকৃতির। সুস্পষ্ট লেজ না থাকায় প্রথম দেখায় জেলেরা মাছটির প্রজাতি শনাক্ত করতে পারেননি।


দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করা জেলে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাগরে অনেক বছর ধরে মাছ ধরছি। নানা ধরনের মাছ জালে উঠেছে। কিন্তু এমন আকৃতির মাছ আগে কখনো দেখিনি। দেখতে একেবারেই আলাদা।’


আরেক জেলে আব্দুর রবও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, জালে ওঠার পর মাছটির অস্বাভাবিক আকৃতি দেখে প্রথমে তাঁরা বুঝতে পারেননি এটি কোন প্রজাতির মাছ।


বৈজ্ঞানিক নাম ‘Ranzania laevis’


মৎস্য বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক শনাক্তকরণ অনুযায়ী, মাছটি ‘স্লেন্ডার সানফিশ’ নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ranzania laevis। এটি মূলত উন্মুক্ত ও গভীর সমুদ্রের একটি সামুদ্রিক মাছ। দেহের গঠন ও চলন অন্যান্য প্রচলিত সামুদ্রিক মাছের তুলনায় বেশ ভিন্ন।


বিশেষজ্ঞরা জানান, সানফিশ পরিবারের মাছ বিভিন্ন সময় সমুদ্রের ওপরের স্তরে উঠে আসতে পারে। সমুদ্রের পানির ওপর ভেসে বা সূর্যের আলোতে শরীর উষ্ণ করার আচরণের সঙ্গে ‘সানফিশ’ নামটির সম্পর্ক রয়েছে।


বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় এ ধরনের মাছ খুব কম দেখা যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে কুয়াকাটা উপকূলের কাছাকাছি এটির ধরা পড়া সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আগ্রহ তৈরি করতে পারে।


গবেষণার জন্য তথ্য সংরক্ষণের পরামর্শ


পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজিব সরকার বলেন, কুয়াকাটা উপকূলে এ ধরনের বিরল সামুদ্রিক মাছ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ। মাছটির ছবি, ওজন, দৈহিক বৈশিষ্ট্য এবং কোথায় ধরা পড়েছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।


তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সামুদ্রিক প্রাণীর বিস্তৃতি ও উপস্থিতি নিয়ে গবেষণায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীর বিষয়ে তথ্যভান্ডার তৈরিতেও এসব রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ।


উপকূলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে নতুন তথ্য


কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর থেকে বেশ কিছু বিরল ও স্থানীয়ভাবে অপরিচিত সামুদ্রিক মাছ পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব মাছের উপস্থিতি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার জলজ পরিবেশ কতটা বৈচিত্র্যময়, তার একটি ধারণা দেয়।


তিনি আরও বলেন, বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী ধরা পড়লে সম্ভব হলে ছবি, ওজন, অবস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে গবেষণা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে সহায়তা পাওয়া যাবে।


স্থানীয় জেলেরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের মাছ ধরা পড়লেও এমন ব্যতিক্রমী আকৃতির মাছ তাঁদের জালে খুব কমই আসে। ফলে স্লেন্ডার সানফিশটি দেখতে মহিপুর মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।


সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বঙ্গোপসাগরের জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে এ ধরনের বিরল প্রজাতির মাছের উপস্থিতি নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।


পটুয়াখালী টুডে

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান: মোঃ আতিকুল ইসলাম
ভাইস চেয়ারম্যান: মোঃ জাকারিয়া হোসেন
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: আব্দুর রহিম মেহেদী
বার্তা সম্পাদক: মোঃ মাসুদ খান

কপিরাইট © ২০২৬ পটুয়াখালী টুডে । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
কুয়াকাটা উপকূলে জেলের জালে বিরল ‘স্লেন্ডার সানফিশ’
0:00 0:00
1.0x