বর্ষার পানিতে মাঠ-ঘাট এখন কৃষিকাজের উপযোগী। কাদামাটিতে প্রাণ ফিরে পাওয়ায় পটুয়াখালীর বাউফলে শুরু হয়েছে আমন মৌসুমের জমি প্রস্তুতের ব্যস্ততা। কেউ ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করছেন, কেউ মই দিয়ে জমি সমান করছেন, আবার কেউ চারা রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
চলতি আমন মৌসুমে বাউফল উপজেলায় ৩৪ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে উপজেলা কৃষি অফিস। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মাঠজুড়ে এখন কৃষকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় চলতি মৌসুমে আমন আবাদ নিয়ে তারা আশাবাদী। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চারা রোপণের কাজ শেষ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নেমে পড়ছেন কৃষকরা। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে জমি চাষ, মই দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও জমি প্রস্তুতের কাজ। আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের কারণে আগের তুলনায় জমি প্রস্তুতের সময় কিছুটা কমলেও চারা রোপণের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে।
চলতি মৌসুমে দেশি জাতের ধানের পাশাপাশি ব্রিধান-৫২, ৭৮, ৯৭ ও ১০৩, বিআর-২৩ এবং বিনা ধান-৭, ১৭ ও ২৬ জাতের ধান চাষ করছেন কৃষকরা। এর পাশাপাশি স্থানীয় উচ্চফলনশীল উফশি জাত, লাল মোটা, সাদা মোটা ও কাজলশাইল ধানেরও আবাদ হচ্ছে।
কৃষকরা জানান, প্রয়োজনীয় শ্রমিক না পাওয়ায় অনেককে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে চারা রোপণের কাজ করতে হচ্ছে। এতে সময় যেমন বেশি লাগছে, তেমনি বেড়ে যাচ্ছে শ্রম ব্যয়ও।
উপজেলার কালিশুরী ইউনিয়নের কৃষক আবু জয়নাল ও মোসারেফ হোসেন জানান, দুই জৈষ্ঠ জমিতে চারা রোপণের জন্য দুইজন শ্রমিককে তিন বেলা খাবারসহ প্রায় দুই হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। দুইজন শ্রমিক দিনে দেড় থেকে কখনো দুই জৈষ্ঠ জমিতে চারা রোপণ করতে পারেন।
বগা ইউনিয়নের কৃষক আঃ জালাল, রাজ্জাক ও শহিদ বলেন, কৃষিকাজে আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের কারণে জমি প্রস্তুত করতে সময় কম লাগছে। সময়মতো চারা রোপণ করতে পারলে ধানও যথাসময়ে ঘরে তোলা সম্ভব হবে। তাই এবার ভালো ফলনের আশা করছেন তারা।
গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইব্রাহিম ও বারেক হাওলাদার বলেন, আমন মৌসুমকে ঘিরে শুধু কৃষকরাই ব্যস্ত থাকেন না; কৃষিশ্রমিক, ট্রাক্টর ও কৃষিযন্ত্রচালক, পরিবহন শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও কাজের সুযোগ পান। ফলে আমন মৌসুমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে এবং স্থানীয় বাজারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পায়।
কৃষকদের প্রত্যাশা, মৌসুমের বাকি সময় আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার আমনের ভালো ফলন হবে। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ তাদের পরিশ্রমকে সার্থক করবে এবং কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে বলে আশা করছেন তারা। ভালো ফলন হলে এর ইতিবাচক প্রভাব গ্রামীণ অর্থনীতিতেও পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিলন জানান, বাউফল উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে মোট ৩৫ হাজার ২০০ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আবাদ সম্পন্ন হলে এ মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সরাসরি মাঠ পরিদর্শনের পাশাপাশি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলছেন। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমন আবাদ নিশ্চিত করতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গেও নিয়মিত মতবিনিময় করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আমনের ভালো ফলন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মতামত