পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রায় ৬ একর কৃষিজমি চাষাবাদে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বড় ছেলে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা হওয়ায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তাদের বৈধ মালিকানাধীন জমিতে চাষাবাদ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এতে গত প্রায় দুই বছর ধরে মূল্যবান কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বালিয়াতলী ইউনিয়নের বড় বালিয়াতলী গ্রামে। এ ঘটনায় জমির মালিক দাবিদার আবদুল খালেক স্থানীয় থানায় নজরুল ইসলাম নকুকে প্রধান করে চারজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে তিনি জমিতে চাষাবাদে বাধা, দখলের চেষ্টা এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকির কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নজরুল ইসলাম নকু। তার দাবি, জমিগুলো তাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি এবং আবদুল খালেকের পরিবারের কাছে মেয়াদি পাট্টা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। সেই মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষে জমি ফেরত চাওয়ায় উল্টো তাদের বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের ভোগদখল
আবদুল খালেকের দাবি, তিনি, তার ভাই, স্ত্রী ও ছেলেদের নামে বড় বালিয়াতলী মৌজায় মোট ৫ দশমিক ৭৫ একর জমি ক্রয়সূত্রে মালিকানাধীন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন। এমনকি জমির বিএস রেকর্ডেও তাদের নাম রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৫৪ সাল থেকে তাদের পরিবার ওই জমি ভোগদখল ও চাষাবাদ করে আসছে। বছরের পর বছর ধরে তারা সেখানে বিভিন্ন ধরনের কৃষিকাজ করেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর থেকেই স্থানীয় প্রতিপক্ষের কয়েকজন ব্যক্তি জমিতে চাষাবাদে বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ তার।
আবদুল খালেকের অভিযোগে নজরুল ইসলাম নকু, হানিফ মিয়া, বশির মুন্সী ও সোহেল মুন্সীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
চাষাবাদ বন্ধ, জমি পড়ে আছে অনাবাদি
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, দীর্ঘদিন ধরে আবদুল খালেকের পরিবারকে ওই জমিতে চাষাবাদ করতে দেখা গেছে। বর্তমানে জমিতে কোনো ধরনের কৃষিকাজ না হওয়ায় বড় একটি অংশ অনাবাদি পড়ে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার মৃধা ও মো. নেছার বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা আবদুল খালেককে ওই জমিতে চাষাবাদ করতে দেখেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধের কারণে জমিতে চাষাবাদ বন্ধ রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ থাকায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় এক ধরনের উত্তেজনাও বিরাজ করছে। দ্রুত বিরোধের আইনগত নিষ্পত্তি হলে জমিটি আবার কৃষিকাজের আওতায় আসবে বলে তারা মনে করেন।
রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বাধার অভিযোগ
আবদুল খালেকের বড় ছেলে শামীম-আল-সাইফুল সোহাগ যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পরিবারের দাবি, ছেলের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তারা প্রতিপক্ষের চাপের মুখে পড়েছেন।
শামীম-আল-সাইফুল সোহাগ অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বৈধ মালিকানাধীন জমি দখলের চেষ্টা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা জমিটি ভোগদখল করে আসছেন এবং রেকর্ডপত্রও তাদের পক্ষে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যদি কোনো পরিবারের বৈধ সম্পত্তিতে চাষাবাদ করতে বাধা দেওয়া হয়, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা চাই বিষয়টি আইনগতভাবে তদন্ত করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা হোক এবং জমিতে শান্তিপূর্ণভাবে চাষাবাদের সুযোগ দেওয়া হোক।’’
‘মেয়াদি পাট্টার জমি’, দাবি প্রতিপক্ষের
তবে আবদুল খালেকের পরিবারের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন নজরুল ইসলাম নকু। তিনি বলেন, ওই জমির সঙ্গে তাদের পরিবারের পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে। তার দাদা আমির হোসেনের কাছ থেকে মেয়াদি পাট্টা হিসেবে জমিগুলো খালেকদের দেওয়া হয়েছিল। সেই পাট্টার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
নজরুল ইসলাম নকুর দাবি, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তারা জমি ফেরত চাইলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তিনি বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি কারও ওপর হামলা বা মারধরের সঙ্গে জড়িত নই। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিএনপির লোকজন জমি দখল করছে—এমন অভিযোগও সঠিক নয়। জমির প্রকৃত মালিকানা ও দখলের বিষয়টি আইনগতভাবে যাচাই করলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’’
পুলিশের সতর্ক অবস্থান
জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের বিষয়ে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আইনগতভাবে দেখা হচ্ছে। জমি নিয়ে কোনো মামলা আদালতে চলমান থাকলে সেটি আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে।
তিনি বলেন, জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৫ দশমিক ৭৫ একর কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকায় স্থানীয় কৃষি ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধটি দ্রুত আইনগতভাবে নিষ্পত্তি হবে। একই সঙ্গে কোনো পক্ষ যাতে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সে বিষয়েও প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি থাকবে।
জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবির মধ্যে এখন আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিন অনাবাদি পড়ে থাকা কৃষিজমিতে আবারও চাষাবাদ শুরু হবে।
মতামত