পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের মধ্য মদনপুরা এলাকায় প্রায় তিন দশক ধরে কাঁচা অবস্থায় পড়ে আছে ১ হাজার ৮০০ মিটার দীর্ঘ একটি মাটির সড়ক। দীর্ঘ ৩০ বছরেও সড়কটি পাকা না হওয়ায় চার গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমে সড়কটি হাঁটুসমান কাদায় পরিণত হয়। এতে শিক্ষার্থী, রোগী, বয়স্ক মানুষ ও সাধারণ পথচারীদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সড়কটি পাকাকরণের দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার যুগেও চার গ্রামের মানুষকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন জনপদের মতো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বর্ষায় সড়কজুড়ে কাদা
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মধ্য মদনপুরা বদর আলী খান জামে মসজিদ থেকে পশ্চিম মাঝপাড়া হয়ে সোনামদ্দিন মৃধা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিটার সড়কের পুরো অংশই কাঁচা। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে পানি জমে যায়। একপর্যায়ে পুরো সড়ক থকথকে কাদায় পরিণত হয়।
সড়কের কোথাও কোথাও চলাচলের উপযোগী করার জন্য স্থানীয়ভাবে বালির বস্তা ফেলে সরু পথ তৈরি করা হয়েছে। সেই সরু পথ দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন মানুষ। পিচ্ছিল কাদায় প্রায়ই পথচারীদের পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই পথ পাড়ি দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষাকালে সড়কটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করাও কষ্টকর হয়ে ওঠে। মোটরসাইকেল, ভ্যান, অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রয়োজনের সময় কেউ অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া নিয়ে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে শিক্ষার্থী ও রোগীরা
এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল চার গ্রামের মানুষের মধ্যে শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। সড়কের করুণ অবস্থার কারণে বর্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ফলে তাদের পড়াশোনায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের বেলায় কারও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। কাদামাখা সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে না পারায় অনেক সময় রোগীকে কাঁধে বা অন্য কোনো উপায়ে মূল সড়ক পর্যন্ত নিতে হয়। এতে জরুরি চিকিৎসা পেতে সময় লেগে যায়।
এ ছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহনেও সমস্যায় পড়তে হয় স্থানীয় কৃষকদের। কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা সড়কের কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ গুনতে হয়। বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে জানান তারা।
৩০ বছরেও বদলায়নি চিত্র
স্থানীয় বাসিন্দা নিয়াজ খান বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে এই সড়কে মাটির কাজ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও সড়কটির আর তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। অনেক সরকার এসেছে, অনেক জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন হয়েছেন; কিন্তু চার গ্রামের মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি এখনো কাঁচাই রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সন্তানরা এই কাঁচা রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায়। বৃষ্টির সময় তাদের পোশাক ও বই-খাতা কাদায় নষ্ট হয়ে যায়। অসুস্থ রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে হলে আরও বড় বিপদে পড়তে হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা সড়কটি পাকা করার দাবি জানিয়ে আসছি।’’
স্থানীয়দের দাবি, সড়কটি পাকা করা হলে শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নই হবে না, চার গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। শিক্ষার্থী ও রোগীদের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হবে।
দ্রুত সড়ক নির্মাণের দাবি
সোনামদ্দিন মৃধা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে হলে সড়কটির উন্নয়ন জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে এটি কাঁচা পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ নিলে শিক্ষার্থীসহ পুরো এলাকার মানুষের উপকার হবে।’’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়কটি চার গ্রামের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন না হওয়ায় বর্ষাকালে এটি কার্যত বিচ্ছিন্ন সড়কে পরিণত হয়। তাই আর আশ্বাস নয়, দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ করে সড়কটি পাকা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল ফরাজী বলেন, সড়কটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিন দশক ধরে কাঁচা থাকা এই সড়কটি কবে পাকা হবে—এ প্রশ্নই এখন চার গ্রামের মানুষের। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে সড়কটি নির্মাণ করবে এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেবে কয়েক হাজার মানুষকে।
মতামত