স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বরিশালে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে। বক্তারা বলেছেন, শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিলেও রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে এখনো তাদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশার তুলনায় কম। নারীদের জন্য রাজনৈতিকভাবে সমান সুযোগ তৈরি না হলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শনিবার (১৫ আগস্ট) বরিশাল নগরীর সদর রোডের বিডিএস মিলনায়তনে ‘নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্ব: প্রত্যাশা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে বরিশাল জেলার বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক।
সকাল ১১টায় সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মেহেরুন নাহার মুন্নি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক বরিশাল মহানগর কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল মোতালেব হাওলাদার, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের মহানগর সভাপতি অধ্যাপক ফারহানা তিথি, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বরিশাল জেলা আহ্বায়ক আবু সাঈদ মুসা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারী উইং-মহিলা শাখার মহানগর সেক্রেটারি তানিয়া রশিদ নিপু এবং গণঅধিকার পরিষদ মহানগর কমিটির প্রচার সম্পাদক মাহফুজ নুসরাত মুনা।
সুজন বরিশাল জেলা সভাপতি অধ্যাপক গাজী জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের বরিশালের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মেহের আফরোজ মিতা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের বরিশাল জেলা সম্পাদক সাধনা রাণী ব্যাপারী।
‘সংরক্ষিত পদ থাকলেও মূল নেতৃত্বে নারীর সুযোগ কম’
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, দেশে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ কাঠামোয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদ থাকলেও সাধারণ বা গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।
তাঁদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদে নারীদের জন্য তিনটি সংরক্ষিত সদস্যপদ এবং উপজেলা পরিষদে নারী ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থাকলেও চেয়ারম্যান পদে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব নারীদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন করে তুলছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধিরাও বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্প পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নারীর উন্নয়নের কথা বললেও অনেক ক্ষেত্রে দলীয় মূল কমিটিতে নারীদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
‘যোগ্যতা প্রমাণ করেও রাজনীতিতে পিছিয়ে নারীরা’
বক্তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীরা ভালো ফলাফল করছেন। পাশাপাশি চাকরি ও ব্যবসায়ও নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থান তৈরি করলেও রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে নারীরা কেন পিছিয়ে থাকবেন—এ প্রশ্নও তোলেন তাঁরা।
তাঁরা বলেন, সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধিদের অনেক সময় যথাযথ সম্মান ও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থ ও পেশিশক্তির সীমাবদ্ধতা নারীদের রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখছে। পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও নারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের জন্য কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, রাজনীতিতে নারীদের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা গেলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়বে।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
গোলটেবিল বৈঠকে ব্লাস্ট বরিশাল ইউনিটের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শাহিদা তালুকদার, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক রেশমা রহমান, ডেইলি স্টারের বরিশাল প্রতিনিধি সিনিয়র সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ, সুজন বরিশাল জেলা সম্পাদক রণজিৎ দত্ত, মহানগর সম্পাদক রফিকুল আলম, ঝালকাঠি জেলা সম্পাদক সাংবাদিক ইসমাঈল মুসাফির, বাবুগঞ্জ উপজেলা সুজন সভাপতি সেলিম রেজা, সুজন সম্পাদক ও বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি আরিফ আহমেদ মুন্না, ইউপি সদস্য ফাতেমা আক্তার লিপি, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের বরিশাল জেলা সমন্বয়কারী হাদিউজ্জামান সুজন, ইয়ুথ লিডার শুভ চৌধুরী ও মালিহা আক্তার বক্তব্য দেন।
দিনব্যাপী এ আয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য, এনজিও প্রতিনিধি, তরুণ নেতৃত্ব এবং বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মতামত