বরগুনা আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিক আসাদ সবুজকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় হাজির করার ঘটনায় সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। আদালত চত্বরে দুই পুলিশ সদস্যের মাঝে হাতকড়া পরা অবস্থায় সাংবাদিক আসাদ সবুজকে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর সন্তান বাবাকে দেখে ছুটে এসে জামা আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য উপস্থিত অনেকের মধ্যে আবেগ ও ক্ষোভের জন্ম দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
আসাদ সবুজ দৈনিক কালবেলার বরগুনা জেলা প্রতিনিধি এবং বরগুনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাবাকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখে শিশুটি তাঁর কাছে ছুটে যায়। এ সময় এক পুলিশ সদস্য শিশুটিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে পেছনে হাতকড়া পরা অবস্থাতেই পানি পান করতে দেখা যায় সাংবাদিক আসাদ সবুজকে। আদালত প্রাঙ্গণের এই দৃশ্য সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, মানবিকতা এবং একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে আচরণের ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সাংবাদিক গ্রেপ্তার হতে পারেন—আইনের প্রয়োজনে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয় আদালতের এখতিয়ারাধীন। তবে অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই একজন সাংবাদিককে এমনভাবে উপস্থাপন করা কতটা প্রয়োজনীয় ছিল, সেটিই এখন সাংবাদিক সমাজের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আসাদ সবুজের গ্রেপ্তার নিয়ে সাংবাদিক মহলের ক্ষোভ, নিন্দা এবং তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তাঁকে হাতকড়া পরানোর বিষয়টি আইনসম্মত ছিল কি না, তা তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে।
একজন সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া—প্রশ্ন শুধু আসাদ সবুজকে ঘিরে নয়
সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই ও জনস্বার্থের বিষয় তুলে ধরা সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তার বিচার হবে আদালতে—এটাই আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই একজন সংবাদকর্মীকে জনসমক্ষে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক সমাজের প্রশ্ন, আসাদ সবুজের বিরুদ্ধে যে অভিযোগই থাকুক, তাঁর সঙ্গে আইনানুগ ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করা হয়েছে কি না। হাতকড়া ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা, পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সাংবাদিকরা।
কারণ একজন সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় হয়ে থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন পরিবেশ, পেশাগত মর্যাদা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্ন।
নিঃশর্ত মুক্তির দাবি সাংবাদিক সমাজের
আসাদ সবুজের গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও সাংবাদিকরা তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং তাঁকে হাতকড়া পরানোর ঘটনায় কোনো আইন বা বিধি লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সাংবাদিকদের দাবি, কোনো সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে—এতে আপত্তির সুযোগ নেই। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি একজন সংবাদকর্মীর মানবিক ও পেশাগত মর্যাদাও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
বরগুনার আদালত প্রাঙ্গণের এই দৃশ্য তাই শুধু একটি পরিবারের কষ্টের ছবি নয়; এটি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা—আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টির দ্রুত সমাধান হবে এবং সাংবাদিক আসাদ সবুজের নিঃশর্ত মুক্তির পথ সুগম হবে।
সাংবাদিকের কলমকে ভয় দেখিয়ে নয়, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই সব অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত—এটাই সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা।
মতামত