পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার জুগির হাওলা গ্রামে কৃত্রিম খালের মাধ্যমে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানোকে কেন্দ্র করে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এতে মিষ্টি পানির সংকটে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ একর কৃষিজমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। বর্ষা মৌসুমে ধান চাষ করতে না পারার পর এবার শীতকালীন ও মৌসুমি তরমুজ চাষ নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁরা। ফলে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে এলাকার কৃষকদের।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জুগির হাওলা গ্রামের কৃষক মো. সোহেল গাজীর রেকর্ডীয় জমির ওপর দিয়ে একটি কৃত্রিম খাল কেটে দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো হচ্ছে। অভিযোগের তীর স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফোরকান তালুকদার, লিটন তালুকদার ও শানু তালুকদারের বিরুদ্ধে। তাঁদের বিরুদ্ধে ওই খালের পানি ব্যবহার করে মাছ চাষের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী সোহেল গাজীর দাবি, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর রেকর্ডীয় জমির মধ্য দিয়ে কৃত্রিম খাল তৈরি করা হয়। এর ফলে জোয়ারের লবণাক্ত পানি আশপাশের কৃষিজমিতে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার কৃষকরা মিষ্টি পানির সংকটে ভুগছেন।
তিনি জানান, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের জমিতে লবণাক্ত পানির প্রবেশ ঠেকাতে খালের অংশে বাঁধ নির্মাণ করেন। পরে সেই বাঁধ কেটে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জোয়ারের পানির চাপে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে আবার বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিলে তাঁকে বাধা ও হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন সোহেল গাজী।
এদিকে বিরোধকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে মানববন্ধন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। সোহেল গাজীর অভিযোগ, স্মারকলিপিতে তাঁর রেকর্ডীয় জমিকে খাসজমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সঠিক নয়। এ নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, খালের মাধ্যমে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ একর জমিতে মিষ্টি পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে বর্ষা মৌসুমে ধান চাষ ব্যাহত হয়েছে। এখন তরমুজ চাষের মৌসুম শুরু হলেও জমিতে লবণাক্ত পানির প্রভাবে চাষাবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে জমি প্রস্তুত ও অন্যান্য কাজে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। সময়মতো চাষ শুরু করতে না পারলে তাঁদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
স্থানীয় কৃষক মো. লিমন মুন্সি বলেন, “বাঁধ না থাকায় বর্ষা মৌসুমে আমরা ধান চাষ করতে পারিনি। এখন তরমুজ চাষের সময়। এ জন্য অনেক কৃষক টাকা লগ্নি করেছেন। কিন্তু জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে থাকায় মিষ্টি পানির অভাবে চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। আমরা চাই, দ্রুত সমস্যার সমাধান করে কৃষকদের ফসল ফলানোর সুযোগ করে দেওয়া হোক।”
ভুক্তভোগী সোহেল গাজী বলেন, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্তের পর তাঁকে নিজের রেকর্ডীয় জমিতে বাঁধ দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং প্রতিপক্ষকে সেখানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি নিজের জমি ও আশপাশের কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এবং স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হাসান বলেন, “জোয়ার-ভাটার পানি ওঠানামায় বাধা দেওয়া যাবে না। যারা বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করবেন, আমি তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
এ অবস্থায় জমির মালিকানা, খালের অবস্থান, পানি প্রবাহের বিষয় এবং কৃষকদের চাষাবাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে খালের বিষয়ে আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করে কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানির অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। দ্রুত সমাধান না হলে আসন্ন তরমুজ মৌসুমে এলাকার বহু কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মতামত