পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের কারণে বন্ধ থাকা বরফকলগুলো থেকে বরফ না পেয়ে বিপাকে পড়েন এক মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা। চার থেকে পাঁচটি বরফকল ঘুরেও বরফ সংগ্রহ করতে না পেরে তাঁরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বিশেষ অনুমতি নিয়ে একটি বন্ধ বরফকল সাময়িকভাবে চালু করে বরফ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে গলাচিপা পৌরশহরের খেয়াঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মৃত ব্যক্তির নাম মো. বেল্লাল সরদার (৪০)। তিনি উপজেলার উত্তর চরকাজল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।
স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, বেল্লাল সরদার দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগ, জ্বরসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে ঢাকায় নেওয়া হলেও পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্বজনেরা জানান, মরদেহ বরিশাল থেকে নদীপথে বাড়িতে নিয়ে আসা এবং দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়স্বজনের শেষবারের মতো দেখার সুযোগ করে দিতে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। এ জন্য মরদেহ সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে বরফের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু খেয়াঘাট এলাকার চার থেকে পাঁচটি বরফকল ঘুরেও তাঁরা বরফ পাননি। এতে মরদেহ সংরক্ষণ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের সংরক্ষণ অভিযান চলছে। এ অভিযানের অংশ হিসেবে জেলা কমিটির সিদ্ধান্তে গলাচিপার সব বরফকল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনেও বরফ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলে ইউএনও আবুজর মোহাম্মদ ইজাজুল হক দ্রুত জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ফারুকুজ্জামানকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। তাঁর উপস্থিতিতে একটি বন্ধ বরফকল সাময়িকভাবে খুলে বরফ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। বরফ সংগ্রহের কাজ শেষ হলে বরফকলটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ইউএনও আবুজর মোহাম্মদ ইজাজুল হক বলেন, “সংকটটির কথা শুনে আমরা দ্রুত জেলা পর্যায়ে জানাই। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের মানবিক অনুমতি সাপেক্ষে আমাদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে বরফ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
বরফকলের মালিক মুনতাসীর রহমান তালুকদার জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গত দুই দিনে একাধিক মৃতদেহের জন্য বরফ সরবরাহ করতে পারেননি তাঁরা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, সরকারি আদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই মূলত বরফকলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দাবি, অতীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের সময় জরুরি ও মানবিক প্রয়োজন বিবেচনায় অন্তত একটি বরফকল চালু রাখার ব্যবস্থা করা হতো। এবার সব বরফকল বন্ধ থাকায় মরদেহ সংরক্ষণের পাশাপাশি খামারের চাষের মাছ পরিবহন ও সংরক্ষণেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের পাশাপাশি জরুরি মানবিক প্রয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এ জন্য নিষেধাজ্ঞার সময়েও নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রশাসনিক তদারকির আওতায় অন্তত একটি বরফকল চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফল করার পাশাপাশি মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে কার্যকর সমন্বয় ও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মতামত