ঢাকা    সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
পটুয়াখালী টুডে

দশমিনায় তেঁতুলিয়ার আকস্মিক ভাঙন ঘরবাড়ি-কবরস্থান হুমকিতে, আতঙ্কে হাজিরহাটের মানুষ



দশমিনায় তেঁতুলিয়ার আকস্মিক ভাঙন    ঘরবাড়ি-কবরস্থান হুমকিতে, আতঙ্কে হাজিরহাটের মানুষ
দশমিনায় তেঁতুলিয়ার আকস্মিক ভাঙন ঘরবাড়ি-কবরস্থান হুমকিতে, আতঙ্কে হাজিরহাটের মানুষ

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে আকস্মিক নদীভাঙনে হাজিরহাট এলাকায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। নদীর আগ্রাসনে ইতোমধ্যে সড়কের একটি অংশ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেলা জিওব্যাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে নদীতীরবর্তী প্রায় ৫০টি বসতঘর এবং শতাধিক কবরস্থান চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙন শুরু হয়। একপর্যায়ে নদীতীর রক্ষায় দেওয়া জিওব্যাগসহ সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে চলে যায়। এতে সড়কের সঙ্গে নদীর সংযোগস্থলে বড় ধরনের ধস তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা ও দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম। পরে ভাঙনকবলিত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

স্রোতের টানে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে জিওব্যাগ

সরেজমিনে দেখা যায়, হাজিরহাট লঞ্চঘাটের পশ্চিম-উত্তর পাশে নদীর তীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ফেলা শতাধিক জিওব্যাগ তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতের টানে একের পর এক ধসে নদীতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে সংলগ্ন পাকা সড়কের পিচ ও মাটির অংশও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

সড়ক ও নদীর সংযোগস্থলে বড় ধরনের ফাটল ও ধস তৈরি হওয়ায় যেকোনো সময় সড়কের আরও অংশ নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এতে হাজিরহাট এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিন ধরেই তেঁতুলিয়া নদীতে পানির চাপ ও স্রোত বাড়ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় হাজিরহাট লঞ্চঘাট ও জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় নদীর তীরে ধস দেখা দেয়। ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর পক্ষ থেকে জিওব্যাগ ফেলা হলেও প্রবল স্রোতের কাছে তা টিকতে পারছে না।

কবরস্থান ঘিরে স্বজনদের উদ্বেগ

ভাঙনের কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হাজিরহাট এলাকার কবরস্থানগুলো নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আরও শতাধিক কবর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা নিজামুদ্দিন বলেন, ‘‘আজ রাতের মধ্যে আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। তাই স্থানীয়দের সহযোগিতায় ঘরের প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিয়েছি। রাতে হয়তো অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে।’’

নিজামুদ্দিন আরও বলেন, ‘‘আমার বাবা খলিল মিয়া গত বছর মারা গেছেন। আমাদের পারিবারিক কবরস্থানও এখন নদীভাঙনের ঝুঁকিতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাবার ও দাদার কবরের মরদেহ সরিয়ে নিরাপদ পারিবারিক কবরস্থানে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে।’’

তিনি জানান, সন্ধ্যার তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেগুলো রক্ষা করার মতো সময় বা সুযোগ স্থানীয়রা পাননি। দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

‘আজ রাত কোথায় কাটাব, জানি না’

ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকজন গৃহবধূ বলেন, নদীর তীব্র স্রোতে তাদের ঘরবাড়ি যেকোনো সময় নদীতে চলে যেতে পারে। ঘর হারালে পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়েও তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

তারা বলেন, ‘‘এই ভাঙনের পর আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। জানি না আজ রাত কীভাবে কাটবে। আমাদের স্বজনদের কবরও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাতের মধ্যে ঘরবাড়িও ভেঙে যেতে পারে। আমরা দ্রুত সাহায্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা চাই।’’

দীর্ঘদিনের ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি ও বসতভিটা

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন হাজিরহাট এলাকায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে নদীর আগ্রাসনে এ এলাকার বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

তাদের দাবি, নদীভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় জিওব্যাগ ফেলা হলেও স্থায়ী ও টেকসই নদীশাসনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা ও নদীতে পানির চাপ বাড়লেই নতুন করে ভাঙন শুরু হয়।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হাজিরহাট বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ঐতিহ্যবাহী হাজিরহাট জামে মসজিদ, হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের আরও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

তারা দ্রুত জিওব্যাগ ডাম্পিং জোরদার করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ ও টেকসই নদীশাসনের দাবি জানিয়েছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে

পরিস্থিতি বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

ভাঙনকবলিত এলাকায় থানা পুলিশ, নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছে। রাতে নদীর পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা হচ্ছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনওর

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে নদীর তীব্র স্রোতে সড়কের অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা গেছে।

তিনি বলেন, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে।

ইউএনও আরও বলেন, নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর থেকে কয়েকটি পরিবারকে সরিয়ে হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে।

তিনি জানান, নদীভাঙনে কোনো পরিবার বসতভিটা ও জমিজমা হারালে তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ, নৌপুলিশ ফাঁড়ি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করবেন। একই সঙ্গে স্থানীয়দের ধৈর্য ধারণ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

রাত বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে আতঙ্ক

এদিকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন হাজিরহাটের মানুষ। বিশেষ করে নদীর একেবারে তীরঘেঁষা বসতবাড়িগুলোর বাসিন্দারা প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সাময়িকভাবে জিওব্যাগ ফেলার পাশাপাশি তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী ও কার্যকর নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হবে। তা না হলে প্রতিবছরই নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

হাজিরহাটের মানুষের এখন একটাই দাবি—আর কোনো ঘর যেন নদীতে না যায়, আর কোনো স্বজনের কবর যেন তেঁতুলিয়ার স্রোতে হারিয়ে না যায়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে নদীর আগ্রাসন থামিয়ে তাদের বসতভিটা ও জনপদ রক্ষা করা হোক।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

পটুয়াখালী টুডে

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


দশমিনায় তেঁতুলিয়ার আকস্মিক ভাঙন ঘরবাড়ি-কবরস্থান হুমকিতে, আতঙ্কে হাজিরহাটের মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে আকস্মিক নদীভাঙনে হাজিরহাট এলাকায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। নদীর আগ্রাসনে ইতোমধ্যে সড়কের একটি অংশ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেলা জিওব্যাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে নদীতীরবর্তী প্রায় ৫০টি বসতঘর এবং শতাধিক কবরস্থান চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙন শুরু হয়। একপর্যায়ে নদীতীর রক্ষায় দেওয়া জিওব্যাগসহ সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে চলে যায়। এতে সড়কের সঙ্গে নদীর সংযোগস্থলে বড় ধরনের ধস তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।


ঘটনার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা ও দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম। পরে ভাঙনকবলিত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।


স্রোতের টানে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে জিওব্যাগ


সরেজমিনে দেখা যায়, হাজিরহাট লঞ্চঘাটের পশ্চিম-উত্তর পাশে নদীর তীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ফেলা শতাধিক জিওব্যাগ তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতের টানে একের পর এক ধসে নদীতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে সংলগ্ন পাকা সড়কের পিচ ও মাটির অংশও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।


সড়ক ও নদীর সংযোগস্থলে বড় ধরনের ফাটল ও ধস তৈরি হওয়ায় যেকোনো সময় সড়কের আরও অংশ নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এতে হাজিরহাট এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিন ধরেই তেঁতুলিয়া নদীতে পানির চাপ ও স্রোত বাড়ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় হাজিরহাট লঞ্চঘাট ও জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় নদীর তীরে ধস দেখা দেয়। ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর পক্ষ থেকে জিওব্যাগ ফেলা হলেও প্রবল স্রোতের কাছে তা টিকতে পারছে না।


কবরস্থান ঘিরে স্বজনদের উদ্বেগ


ভাঙনের কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হাজিরহাট এলাকার কবরস্থানগুলো নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আরও শতাধিক কবর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।


ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা নিজামুদ্দিন বলেন, ‘‘আজ রাতের মধ্যে আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। তাই স্থানীয়দের সহযোগিতায় ঘরের প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিয়েছি। রাতে হয়তো অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে।’’


নিজামুদ্দিন আরও বলেন, ‘‘আমার বাবা খলিল মিয়া গত বছর মারা গেছেন। আমাদের পারিবারিক কবরস্থানও এখন নদীভাঙনের ঝুঁকিতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাবার ও দাদার কবরের মরদেহ সরিয়ে নিরাপদ পারিবারিক কবরস্থানে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে।’’


তিনি জানান, সন্ধ্যার তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেগুলো রক্ষা করার মতো সময় বা সুযোগ স্থানীয়রা পাননি। দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।


‘আজ রাত কোথায় কাটাব, জানি না’


ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকজন গৃহবধূ বলেন, নদীর তীব্র স্রোতে তাদের ঘরবাড়ি যেকোনো সময় নদীতে চলে যেতে পারে। ঘর হারালে পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়েও তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।


তারা বলেন, ‘‘এই ভাঙনের পর আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। জানি না আজ রাত কীভাবে কাটবে। আমাদের স্বজনদের কবরও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাতের মধ্যে ঘরবাড়িও ভেঙে যেতে পারে। আমরা দ্রুত সাহায্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা চাই।’’


দীর্ঘদিনের ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি ও বসতভিটা


স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন হাজিরহাট এলাকায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে নদীর আগ্রাসনে এ এলাকার বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।


তাদের দাবি, নদীভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় জিওব্যাগ ফেলা হলেও স্থায়ী ও টেকসই নদীশাসনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা ও নদীতে পানির চাপ বাড়লেই নতুন করে ভাঙন শুরু হয়।


স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হাজিরহাট বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ঐতিহ্যবাহী হাজিরহাট জামে মসজিদ, হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের আরও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।


তারা দ্রুত জিওব্যাগ ডাম্পিং জোরদার করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ ও টেকসই নদীশাসনের দাবি জানিয়েছেন।


ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে


পরিস্থিতি বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।


ভাঙনকবলিত এলাকায় থানা পুলিশ, নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছে। রাতে নদীর পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করা হচ্ছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।


দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনওর


ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে নদীর তীব্র স্রোতে সড়কের অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা গেছে।


তিনি বলেন, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে।


ইউএনও আরও বলেন, নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর থেকে কয়েকটি পরিবারকে সরিয়ে হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে।


তিনি জানান, নদীভাঙনে কোনো পরিবার বসতভিটা ও জমিজমা হারালে তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ, নৌপুলিশ ফাঁড়ি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করবেন। একই সঙ্গে স্থানীয়দের ধৈর্য ধারণ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।


রাত বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে আতঙ্ক


এদিকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন হাজিরহাটের মানুষ। বিশেষ করে নদীর একেবারে তীরঘেঁষা বসতবাড়িগুলোর বাসিন্দারা প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।


স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সাময়িকভাবে জিওব্যাগ ফেলার পাশাপাশি তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী ও কার্যকর নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হবে। তা না হলে প্রতিবছরই নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।


হাজিরহাটের মানুষের এখন একটাই দাবি—আর কোনো ঘর যেন নদীতে না যায়, আর কোনো স্বজনের কবর যেন তেঁতুলিয়ার স্রোতে হারিয়ে না যায়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে নদীর আগ্রাসন থামিয়ে তাদের বসতভিটা ও জনপদ রক্ষা করা হোক।


পটুয়াখালী টুডে

প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান: মোঃ আতিকুল ইসলাম
ভাইস চেয়ারম্যান: মোঃ জাকারিয়া হোসেন
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃ রাকিব হোসাইন হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: আব্দুর রহিম মেহেদী
বার্তা সম্পাদক: মোঃ মাসুদ খান

কপিরাইট © ২০২৬ পটুয়াখালী টুডে । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
দশমিনায় তেঁতুলিয়ার আকস্মিক ভাঙন ঘরবাড়ি-কবরস্থান হুমকিতে, আতঙ্কে হাজিরহাটের মানুষ
0:00 0:00
1.0x