বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর দেড় বছরের শ্রমে উঠে এসেছে গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি
জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলো। রাজপথে আন্দোলন, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ। ইতিহাসের সেই অগ্নিঝরা সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু স্মৃতিগুলো যেন হারিয়ে না যায়—সেই তাগিদ থেকেই কলম ধরেছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী মোরশেদুল আলম ও নাজিম উদ্দীন।
তাদের দেড় বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় উঠে এসেছে ‘দ্য রেড জুলাই’ নামে একটি বই। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলো, শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ, ত্যাগ ও নানা ঘটনার স্মৃতি নিয়ে লেখা বইটি প্রকাশ করেছে ‘ঐতিহ্য Oitijjhya’ প্রকাশনী। বর্তমানে বইটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোরশেদুল আলম এবং আইন বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাজিম উদ্দীন বইটি রচনার কাজ শুরু করেন ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে। পরে লেখার কাজ এগিয়ে নিতে তারা একসঙ্গে থাকা শুরু করেন। তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলা এবং বিভিন্ন উৎস ঘেঁটে দীর্ঘ সময়ের পর বইটির পাণ্ডুলিপি পূর্ণতা পায়।
যে জুলাই বদলে দিয়েছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
লেখকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মশাল মিছিল ও মোমবাতি প্রজ্বলনের আয়োজন করা হয়। ১৭ জুলাই শহিদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয় শহিদ বেদি।
এরপর ১৮ জুলাই রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের দমনের চেষ্টা করা হলেও শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন প্রতিরোধের মুখে পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ যৌথবাহিনীকে পিছু হটতে হয় বলে বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। আন্দোলনের সেই সময়টিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেছেন দুই লেখক।
শিক্ষার্থীদের সেই প্রতিরোধ, ত্যাগ, সাহস এবং ছাত্র-জনতার সম্মিলিত ভূমিকার নানা স্মৃতি স্থান পেয়েছে ‘দ্য রেড জুলাই’-এর পাতায়।
শূন্যতা থেকেই বই লেখার শুরু
বই লেখার পরিকল্পনা কীভাবে এলো—জানতে চাইলে নাজিম উদ্দীন বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাগুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে কোনো দিনলিপি, সাময়িকী বা স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হবে বলে তিনি আশা করেছিলেন। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও তেমন উদ্যোগ না দেখে বিষয়টি নিয়ে মোরশেদুল আলমের সঙ্গে আলোচনা করেন।
সেখান থেকেই বই লেখার ভাবনা তৈরি হয়।
নাজিম উদ্দীনের ভাষায়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাইয়ের অবদান ও আত্মত্যাগ লিখে রাখা প্রয়োজন—এই দায়িত্ববোধ থেকেই তারা কাজটি শুরু করেন। পরে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর বই লেখার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
দেড় বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই
বইটির তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শিক্ষার্থী, সমন্বয়ক ও বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন লেখকরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে অন-রেকর্ড তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন জার্নাল, বই ও সংবাদপত্র ঘেঁটে ঘটনাগুলো যাচাই করেন তারা।
নাজিম উদ্দীন জানান, প্রায় দেড় বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও লেখার কাজ চলেছে। দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ার পর পাণ্ডুলিপি বইয়ের রূপ নেয়।
‘স্মৃতি ফিকে হলেও ইতিহাস যেন হারিয়ে না যায়’
বইটির পাঠকদের উদ্দেশে নাজিম উদ্দীন বলেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি অনেকটা ধুলোবালির মতো ফিকে হয়ে যেতে পারে। কিন্তু জুলাইয়ের এই অধ্যায় যেন ইতিহাস থেকে হারিয়ে না যায়, সেই ছোট্ট প্রয়াস থেকেই তাদের এই লেখনী।
তথ্যগত কোনো সীমাবদ্ধতা বা অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে গেলে পাঠকদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বইটি পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার প্রত্যাশা, পাঠকেরা ‘দ্য রেড জুলাই’-কে ইতিহাস সংরক্ষণের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখবেন।
শহিদ ও আহত যোদ্ধাদের প্রতি উৎসর্গ
বইটির উৎসর্গ নিয়েও রয়েছে আবেগঘন বার্তা। মোরশেদুল আলম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শহিদ ও আহত যোদ্ধাদের উদ্দেশে বইটি লেখা হয়েছে এবং তাদের প্রতিই বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে।
প্রকাশনার পথেও ছিল বাধা
বই লেখার পর সেটি প্রকাশ করাই ছিল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। মোরশেদুল আলম জানান, রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে সময়ের সঙ্গে জুলাইয়ের মূল চেতনা অনেকটা আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন প্রকাশনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও শুরুতে সাড়া পাননি তারা।
অনেক প্রকাশক বইটি প্রকাশে আগ্রহ দেখাননি। শেষ পর্যন্ত ‘ঐতিহ্য Oitijjhya’ প্রকাশনী বইটি প্রকাশে আগ্রহী হয় এবং তাদের হাত ধরেই ‘দ্য রেড জুলাই’ আলোর মুখ দেখে।
অর্জন একটাই—ইতিহাসকে এক মলাটে আনা
প্রথম বই হিসেবে ‘দ্য রেড জুলাই’ লেখার অভিজ্ঞতাকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন মোরশেদুল আলম। তার মতে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনা ও অবদানকে একত্র করে একটি মলাটের মধ্যে নিয়ে আসতে পারাই তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
তিনি বলেন, বইটি লিখতে গিয়ে তাদের সময়, শ্রম ও ব্যক্তিগত অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়েছে। তবে এই কাজের মধ্য দিয়ে তারা অনেক কিছু শিখেছেন। ভবিষ্যতে আরও বই লিখলে প্রথম বইয়ের অভিজ্ঞতা ও ভুলগুলো তাদের পথ দেখাবে বলেও মনে করেন তিনি।
নবীনদের প্রতি আহ্বান
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মোরশেদুল আলমের আহ্বান—তারা যেন ‘দ্য রেড জুলাই’ পড়েন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সম্পর্কে জানেন।
কারণ, একটি প্রজন্মের চোখে দেখা ইতিহাস অন্য প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই স্মৃতির সবচেয়ে বড় সার্থকতা। আর সেই স্মৃতিকে শব্দে বেঁধে রাখার ছোট্ট প্রয়াসই হয়ে উঠেছে দুই তরুণ শিক্ষার্থীর ‘দ্য রেড জুলাই’।
মতামত