বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আমতলী সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ ও ডিজিটাল অপতথ্য রোধে প্রান্তিক নাগরিক সচেতনতা’ শীর্ষক এ উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সিবিডিপি উপজেলা নাগরিক কমিটির সদস্যরা বৈঠকটি পরিচালনা করেন। এতে এলাকার প্রান্তিক, স্বল্পশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের লোকজন অংশ নেন।
ভাতা ও সরকারি সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী নারীরা সরকারি ভাতা ও খাদ্যসহায়তার তথ্য সময়মতো না পাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণা এবং সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তাঁদের কেউ কেউ জানান, বয়স হয়ে যাওয়া, বিধবা হওয়া কিংবা পারিবারিক অসহায়ত্বের কারণে সরকারি সহায়তা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে কখন ভাতা বা চালের কার্ডের তালিকা তৈরি হয়, সে বিষয়ে অনেক সময় তাঁরা যথাসময়ে জানতে পারেন না।
কয়েকজন অংশগ্রহণকারী অভিযোগ করেন, ভিডব্লিউবি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও তাঁরা কার্ড পাননি। আবার ভাতার কথা বলে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বিকাশ বা নগদের গোপন পিন ও কোড জানতে চাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানান কেউ কেউ।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা পাওয়ার সময় সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, চালের কার্ডে চালের মান ও পরিমাণ নিয়ে অসন্তোষ এবং সরকারি দপ্তর বা হাসপাতালে সেবা নিতে গিয়ে অবহেলার শিকার হওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।
অংশগ্রহণকারীরা জানান, এসব বিষয়ে কোথায় অভিযোগ করতে হয় কিংবা কীভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, সে সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
তথ্য অধিকার আইনে অধিকার আদায়ের কৌশল
বৈঠকে সিবিডিপি নাগরিক কমিটির সদস্যরা তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর বিভিন্ন দিক সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা বোঝান, সরকারি সেবা, ভাতা ও সহায়তা কর্মসূচি সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য জানার জন্য আইনসম্মতভাবে আবেদন করা যায়। নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং তথ্যের ভিত্তিতে সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ডিজিটাল অপতথ্য, ভুয়া বার্তা ও অনলাইন প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত থাকার কৌশল শেখানো হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো বার্তা বা তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস কিংবা প্রচার না করা এবং মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেনের গোপন পিন বা নিরাপত্তা কোড কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তিন দলে ‘ক-ফরম’ পূরণের অনুশীলন
বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ অংশে অংশগ্রহণকারীদের তিনটি ছোট দলে ভাগ করে তথ্য অধিকার আইনের ‘ক-ফরম’ পূরণের অনুশীলন করানো হয়।
প্রথম দল বয়স্ক ভাতার তালিকা, দ্বিতীয় দল প্রতিবন্ধী ভাতার তথ্য এবং তৃতীয় দল ভিডব্লিউবি কার্ড-সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে আবেদন তৈরির অনুশীলন করে। যাঁরা লিখতে পারেন, তাঁরা ফরম পূরণ করেন; অন্যরা প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। লেখাপড়া না জানা প্রবীণ ও নারীদের ফরমে টিপসই দেওয়ার বিষয়টিও অনুশীলন করানো হয়।
এ সময় আবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম, প্রাপ্তিস্বীকার রসিদ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তথ্য অধিকার আইনের বিধান অনুযায়ী সাধারণ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদন পাওয়ার পর ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করেন; তবে আইন ও বিধিতে নির্ধারিত বিশেষ পরিস্থিতিতে সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে।
গুজব ও প্রতারণা প্রতিরোধে অঙ্গীকার
বৈঠক শেষে নীলতরী দলের সদস্য ও সিবিডিপি নাগরিক কমিটির সদস্যরা ভুয়া বার্তা ও গুজব যাচাই করা, মুঠোফোনে গোপন পিন বা কোড কাউকে না দেওয়া এবং দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে সরকারি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করেন। পাশাপাশি তথ্য অধিকার আইনের ‘ক-ফরম’ ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা।
আয়োজকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য জানতে, অনিয়মের বিষয়ে সচেতন হতে এবং আইনসম্মত উপায়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে।
সিবিডিপি নাগরিক প্রকল্পের আওতায় এ উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়। প্রকল্পটি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (Manusher Jonno Foundation) ও আমরাই পারি—উই ক্যানের কারিগরি সহায়তায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডীয় হাইকমিশন ও বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।