পটুয়াখালীর গলাচিপায় উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় আদালতে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি নেত্রী রেনু আক্তারের উপস্থিতি ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার মামলায় কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার তথ্যের মধ্যেই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ওই সভায় তাঁর উপস্থিতির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
গত সোমবার গলাচিপা উপজেলা পরিষদের নতুন সম্প্রসারিত ভবনের সম্মেলনকক্ষে মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হকের সভাপতিত্বে সভায় গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমতিয়াজ আহমেদ, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম মোস্তাফা, গণঅধিকার পরিষদের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক জাকির মুন্সি, যুব অধিকার পরিষদের সহসভাপতি মহিবুল্লাহ এনমি, ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা আবু নাইমসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় রেনু আক্তারের উপস্থিতি সামনে আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার রায় ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি আলোচনায় আসে। রেনু আক্তার গলাচিপা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং চরবিশ্বাস ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের বাসিন্দা।
চেক প্রতারণার মামলায় কারাদণ্ড
প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে চেক ডিজঅনারের অভিযোগে রাজধানীর গুলশান থানায় রেনু আক্তারের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। চলতি বছরের ৪ মে ঢাকা মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ আদালত ওই মামলার রায় দেন। রায়ে তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের দুই দিন পর, ৬ মে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
পরোয়ানার নথিতে রেনু আক্তারের ঠিকানা হিসেবে গলাচিপা উপজেলা সদরের হেলিপ্যাড এলাকা এবং ছিয়াম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে পরিচয়ের উল্লেখ রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে আদালতের ওই পরোয়ানা পটুয়াখালীর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ১৬ আগস্ট গলাচিপা থানায় পাঠানো হয়।
পরোয়ানা থাকার বিষয়টি অস্বীকার রেনুর
তবে নিজের বিরুদ্ধে সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন রেনু আক্তার। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই। তিনি জানান, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে একটি রাজনৈতিক মামলা হয়েছিল এবং ওই মামলায় গত আগস্টে তিনি চট্টগ্রামের একটি আদালতে হাজিরা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, গলাচিপা থানার ওসি মো. ইমতিয়াজ আহমেদ রেনু আক্তারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, পরোয়ানায় আসামির বিস্তারিত পরিচয় না থাকায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় সভার সময় ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। বিষয়টি পরে পুলিশের নজরে আসার পর তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
‘তিনি কমিটির সদস্য নন’
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ইউএনও আবুজর মো. ইজাজুল হক জানিয়েছেন, রেনু আক্তার ওই কমিটির সদস্য নন। তিনি দলীয় নেতাদের সঙ্গে সভাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সাজা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি না, সেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার বিষয় বলেও মন্তব্য করেন ইউএনও।
এদিকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তাফা বলেছেন, রেনু আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। বিষয়টি জানার পর তাঁকে দ্রুত আইনি বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এটি দলীয় কোনো বিষয় নয়।
সভায় উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা
উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সাধারণত স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এমন একটি সভায় একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতের সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তথ্য থাকার পরও তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি সামনে আসায় স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সভাস্থলে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে বিষয়টি আগে কেন শনাক্ত হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে বিষয়টির ব্যাখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে। পুলিশ বলছে, পরোয়ানার নথিতে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য, রেনু আক্তার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ছিলেন না। আর রেনু আক্তার নিজেই তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
এ অবস্থায় আদালতের নথিতে উল্লেখিত সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি এবং সংশ্লিষ্টদের পৃথক বক্তব্যের মধ্যকার অবস্থান স্পষ্ট করতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি জানার পর রেনু আক্তারকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।