পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচি (টিআর/কাবিখা) বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে নেওয়া ৩১৮টি প্রকল্পের বিপরীতে মোট ৩ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ৬০৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক প্রকল্পে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কিংবা কোনো কাজ ছাড়াই বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মাটির রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাঠ ভরাট, অবকাঠামো উন্নয়ন, মেরামত এবং গভীর নলকূপ স্থাপন।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে প্রকল্প তালিকার সঙ্গে বাস্তব অবস্থা মিলিয়ে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত বহু প্রকল্পের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। কোথাও সামান্য কাজ হলেও বরাদ্দের পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
ধুলিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুচরাকাঠি এলাকায় আব্দুল জব্বার মৃধা বাড়ির জামে মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নের জন্য ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, ঈদগাহ মাঠটি আগে থেকেই পাকা এবং সেখানে নতুন করে কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি।
একই এলাকায় বায়তুস সালাহ জামে মসজিদের উন্নয়নের নামে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একই স্থানকে ভিন্ন নামে দেখিয়ে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
বাউফল উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ধুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শরীফ তৌসিফুর রহমান রাফা বলেন, “তালিকায় থাকা অধিকাংশ প্রকল্পের নাম স্থানীয় মানুষ কখনো শোনেননি। বাস্তবায়ন না হওয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা রয়েছে।”
বাউফল ইউনিয়নের দক্ষিণ বিলবিলাস এলাকায় মন্নাত খানের বাড়ি থেকে পল্লী বিদ্যুতের পাকা সড়ক পর্যন্ত মাটির রাস্তা সংস্কারের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়রা সেখানে কোনো কাজের চিহ্ন দেখাতে পারেননি।
একই ইউনিয়নের আলিপুরা গ্রামে রুহুল আমিন হাওলাদারের বাড়ির পশ্চিম পাশ থেকে মির্জা বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সদর ইউনিয়নের গোসিঙ্গা গ্রামের আফছেরের গ্যারেজ থেকে পশ্চিমে রাস্তা পুনর্নির্মাণের জন্য ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়দের দাবি, সেখানে আদৌ কোনো কাঁচা রাস্তার অস্তিত্ব নেই। ওই অংশে রয়েছে বাউফল-বগা মহাসড়ক।
বাউফল উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি মোশারফ হোসেন খান লিটন বলেন, “আমার জানামতে অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। কয়েকটি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।”
দাশপাড়া ইউনিয়নের ইসাহাক ফকির বাড়ি থেকে হোনা গাজী খালের পোল পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজ না করার অভিযোগ উঠেছে।
দাশপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজম চৌধুরী বলেন, “দাসপাড়ার কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো তথ্য স্থানীয়রা জানেন না। নামমাত্র কাজ করে বরাদ্দের অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।”
বাউফল পৌর শহরে উপজেলা পরিষদ গেটসংলগ্ন একটি ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থিত সাংবাদিক ক্লাবের মেরামতের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, এ প্রকল্প সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না।
সাংবাদিক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ক্লাবের নামে কোনো প্রকল্প হয়েছে—এমন তথ্য আমরা জানি না। ফলে অর্থ উত্তোলনের প্রশ্নই ওঠে না।”
একইভাবে পৌর এলাকার একটি ইফতেদায়ী মাদ্রাসার সংস্কারের জন্যও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যদিও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল থেকে পৌর এলাকায় প্রকল্প গ্রহণের বিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্প এলাকায় প্রকল্পের নাম, বরাদ্দ, অর্থবছর ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের তথ্যসম্বলিত সাইনবোর্ড থাকার কথা। কিন্তু অধিকাংশ স্থানে এমন কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ফলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ৩১৮টি প্রকল্পের মধ্যে শতাধিক প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়নি। অথচ অনেক প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। চলতি বছরের ৩০ জুন প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হয়েছে।
বাউফল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এসব প্রকল্প আমার যোগদানের আগেই নেওয়া হয়েছিল। আমি যেসব প্রকল্প সরেজমিনে দেখেছি, সেখানে অনিয়ম পাইনি। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালেহ আহমেদ বলেন, “বিধি অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। কোথাও অনিয়ম বা কাজ অসম্পূর্ণ থাকলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ, বিল-ভাউচার, অর্থ উত্তোলন ও বাস্তব কাজের পরিমাণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। এতে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।