পটুয়াখালীর পর্যটননগরী কুয়াকাটায় জমি বিক্রিকে কেন্দ্র করে আপন ভাই-বোনের বিরোধে জড়িয়ে নয় দিন কারাভোগের অভিযোগ করেছেন মো. জাকির হোসেন নামের এক সহকারী শিক্ষক। তাঁর দাবি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একই জমি তাঁর ছোট ভাই-বোনেরা দুই ব্যক্তির কাছে পৃথকভাবে রেজিস্ট্রি বায়না চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। প্রথম দফায় জমি বিক্রির বায়না বাবদ পাওয়া ১০ লাখ টাকা তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ায় পরবর্তী সময়ে দায়ের করা প্রতারণা মামলায় তাকেও আসামি করা হয়। ওই মামলায় তাঁকে নয় দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় কারাভোগের পাশাপাশি পেশাগত ও সামাজিকভাবেও ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন কুয়াকাটা ৬০ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাকির হোসেন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে কুয়াকাটা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি ছোট ভাই-বোনদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান জাকির হোসেন।
জমি বিক্রির বায়নার টাকা তাঁর হিসাবে
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, কুয়াকাটা পৌর এলাকার পাঞ্জুপাড়া এলাকায় তাঁদের বাবা কাদের সার্ভেয়ারের বন্দোবস্তমূলের প্রায় ৪০ শতাংশ জমি রয়েছে। ওই জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলছিল। পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিটি মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস নামের এক বিনিয়োগকারীর কাছে ৬০ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য তাঁর ছোট ভাই মো. ইদ্রিস, মো. শাহ আলম এবং বোন মোসা. তাসলিমা, পারুল ও শামসুন্নাহার রেজিস্ট্রি বায়না চুক্তি করেন।
জাকিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বায়না চুক্তির অংশ হিসেবে ক্রেতা তাঁর নামে ১০ লাখ টাকার একটি চেক দেন। চেকের অর্থ তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর তিনি সেই টাকা উত্তোলন করেন। পরে স্থানীয়ভাবে অনুষ্ঠিত সালিস বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জমি-সংক্রান্ত মামলার খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট টাকা ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ করে দেন বলে দাবি করেন তিনি।
একই জমি দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে বায়নার অভিযোগ
জাকির হোসেনের অভিযোগ, প্রথম বায়না চুক্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি না করেই এবং আগের চুক্তি ও টাকা গ্রহণের তথ্য গোপন করে তাঁর ছোট ভাই-বোনেরা একই জমি স্থানীয় মাহাতাব উদ্দিন নামের আরেক ব্যক্তির কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যে পুনরায় রেজিস্ট্রি বায়না চুক্তি করেন।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে প্রথম ক্রেতা মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস ও তাঁর সহযোগীরা আগের বায়না চুক্তি অনুযায়ী জমি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর ভাই-বোনেরা আগের চুক্তি ও টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। এ নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে আদালতে প্রতারণার মামলা করা হয়।
জাকিরের দাবি, ওই মামলায় তাঁর নামে দেওয়া চেকের বিষয়টি সামনে আসায় তাকেও আসামি করা হয়। যদিও তিনি নিজে জমি বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং ভাই-বোনদের হয়ে টাকা গ্রহণ ও বণ্টন করেছিলেন বলে দাবি করেন। মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তাঁকে নয় দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
কারাভোগের প্রভাব পড়েছে চাকরিতেও
জাকির হোসেন বলেন, মামলায় কারাগারে থাকার কারণে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারেননি তিনি। এ ঘটনায় জেলা শিক্ষা অফিস থেকে তাঁকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, ভাই-বোনদের জমি বিক্রির বিরোধের দায় নিজের ওপর আসায় তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত জীবনেও সমস্যার মুখে পড়েছেন। নিজের কোনো অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও শুধু তাঁর ব্যাংক হিসাবে বায়নার টাকা জমা হওয়ায় মামলায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
মামলার খরচ নিয়েও বিরোধ
জাকির হোসেন আরও বলেন, তাঁদের বাবার বন্দোবস্ত করা ওই জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলছিল। মামলা পরিচালনা ও নিষ্পত্তির জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। পরবর্তীতে মামলার খরচের টাকা কে দেবেন—এ নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
তিনি দাবি করেন, স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে একাধিকবার সালিস বৈঠক হয়। সেখানে মামলার খরচ বহনের বিষয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে সিদ্ধান্তও হয়। তবে পরে তাঁর ভাই-বোনেরা ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এরপর গত ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে তাঁর ভাই-বোনেরা সংবাদ সম্মেলন করেন বলে জানান জাকির। তাঁর দাবি, ওই সংবাদ সম্মেলনে তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে।
‘দুই দফা বায়নার খেসারত আমাকে দিতে হচ্ছে’
সংবাদ সম্মেলনে জাকির হোসেন বলেন, একই জমি দুই ব্যক্তির কাছে বায়না চুক্তির মাধ্যমে বিক্রির ঘটনায় যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তার দায় তিনি নিতে পারেন না। বরং ভাই-বোনদের কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে মামলার আসামি হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এতে তাঁর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, সামাজিকভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং চাকরিজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানান তিনি।
একই সঙ্গে মামলায় তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি জমি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন তিনি।
ছেলের অভিযোগ, ‘বাবা অপরাধ না করেও আসামি’
সংবাদ সম্মেলনে জাকির হোসেনের ছেলে মো. ইব্রাহিমও বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর চাচা ও ফুফুরা একই জমি দুই ব্যক্তির কাছে বায়না চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি করায় বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু জমি বিক্রির বায়না বাবদ অর্থ তাঁর বাবার ব্যাংক হিসাবে চেকের মাধ্যমে দেওয়ায় মামলায় তাঁর বাবাকেও আসামি করা হয়েছে।
ইব্রাহিম বলেন, মামলায় তাঁর বাবা নয় দিন কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকার কারণে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির অভিযোগে তাঁর চাকরিতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। এতে তাঁদের পরিবারও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ছোট ভাইয়ের বক্তব্য
এ বিষয়ে জাকির হোসেনের ছোট ভাই মো. ইদ্রিস মিয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি একই জমি দুই ব্যক্তির কাছে রেজিস্ট্রি বায়না চুক্তির মাধ্যমে বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এ নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
জাকির হোসেনের দাবি করা ১০ লাখ টাকা ভাগ করে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে ইদ্রিস মিয়া বলেন, তাঁর ভাই জাকির হোসেন তাঁদের কোনো টাকা দেননি।
জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা চলমান থাকায় বিষয়টির প্রকৃত সত্য আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।