নতুন নাট্যদল ‘আগুনমুখা’র আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটেছে পটুয়াখালীতে। দলটির প্রথম প্রযোজনা ‘থিয়েটারওয়ালা’ মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে তাদের নাট্যযাত্রা। পটুয়াখালীর প্রথিতযশা নাট্যব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক ডা. ফজলুল করিমের স্মরণে বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে নাটকটির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনে পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পী, নাট্যকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, বিভিন্ন পর্যায়ের সাংস্কৃতিক সংগঠক ও নাট্যপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন। নতুন একটি নাট্যদলের আত্মপ্রকাশকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যেও ছিল আগ্রহ ও উৎসাহ।
স্মরণে ডা. ফজলুল করিম
নাটক মঞ্চায়নের আগে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ ও আলোচনা পর্ব। এতে বক্তারা পটুয়াখালীর নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে ডা. ফজলুল করিমের দীর্ঘ অবদানের কথা স্মরণ করেন।
বক্তারা বলেন, গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায় তিন দশক ধরে পটুয়াখালী ড্রামাটিক ক্লাবের মাধ্যমে মঞ্চনাটকের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ডা. ফজলুল করিম। দীর্ঘ সময় তিনি সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্বে ছিলেন। পটুয়াখালীতে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরও তিনি এর সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পেশায় চিকিৎসক হলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায়ও তিনি প্রগতিশীল ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্সের সদস্য হিসেবেও তিনি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন বলে আলোচনায় উঠে আসে।
ডা. ফজলুল করিম ১৯২৯ সালের ২৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের একই দিনে তিনি মারা যান। জীবনের শেষ পর্যায়ে সন্তানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন তিনি। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। আলোচনা পর্বে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
তরুণদের নিয়ে নতুন নাট্যদল
‘থিয়েটারওয়ালা’ নাটকের মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ‘আগুনমুখা’। স্বপ্নীল দাসের রচনা এবং আব্দুল্লাহ আশরাফ অপূর্ব (অনীম)-এর নির্দেশনায় একদল তরুণ নাট্যকর্মী নাটকটিতে অভিনয় করেছেন। পটুয়াখালী জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় এটি দলটির প্রথম প্রযোজনা।
নাট্যপ্রদর্শনী শেষে আগামী এক বছরের জন্য ‘আগুনমুখা’র কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলটির উপদেষ্টা মো. তোফায়েল আহমেদ কমিটির ঘোষণা দেন। এতে আব্দুল্লাহ আশরাফ অপূর্বকে সভাপতি এবং মো. শাহারিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিটির অন্যান্য সদস্যদেরও বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়।
‘কঠিন হলেও নাট্যচর্চা চালিয়ে যেতে চাই’
মফস্বল শহরে নিয়মিত থিয়েটার চর্চার নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে দলটির প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা ও তরুণ নাট্যব্যক্তিত্ব মো. তোফায়েল আহমেদ বলেন, মফস্বলে নাট্যচর্চার পরিবেশ ধরে রাখা সহজ নয়। তারপরও এই চ্যালেঞ্জকে পাশ কাটিয়ে যেতে চান না তারা।
তাঁর মতে, একটি শহরের সাংস্কৃতিক বিকাশে থিয়েটারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সৃজনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরিতে নাট্যচর্চা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এসব লক্ষ্য সামনে রেখেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিয়মিত নাট্যচর্চা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ‘থিয়েটারওয়ালা’ নাটকের নির্দেশক আব্দুল্লাহ আশরাফ অপূর্ব বলেন, ‘আগুনমুখা’কে শুধু একটি নাট্যদল হিসেবে নয়, বরং তরুণদের সাংস্কৃতিক চিন্তা ও দায়বদ্ধতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চান তারা। পটুয়াখালীর তরুণদের নিয়ে নিয়মিত নাট্যচর্চার পরিবেশ তৈরি এবং ভালো নাটকের মাধ্যমে দর্শকদের ভাবনার জগতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সমাজের অসংগতির গল্প ‘থিয়েটারওয়ালা’
‘থিয়েটারওয়ালা’ নাটকের রচয়িতা স্বপ্নীল দাস জানান, সমকালীন সমাজের নানা অসংগতি, মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ এবং প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা অসুস্থ প্রতিযোগিতার বাস্তবতা থেকেই নাটকটির ভাবনা এসেছে।
নাটকটিতে বিশেষভাবে এমন মানুষদের জীবন ও সংকট তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, যারা সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশার চাপে নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে সন্তানদের সৃজনশীল বিকাশের পরিবর্তে শুধু ফলাফল ও সাফল্যের পেছনে ছুটতে বাধ্য করার প্রবণতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষের নানা প্রতিবন্ধকতার বিষয়ও নাটকের গল্পে উঠে এসেছে।
রচয়িতার ভাষ্য, বর্তমান বাস্তবতায় সত্য ও সচেতনতার কথা নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা সহজ নয়। তবু সমাজের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে শিল্প ও সংস্কৃতির ভাষায় কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই ‘থিয়েটারওয়ালা’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের নাট্যচর্চা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় রয়েছে তাদের।
নাট্যপ্রদর্শনী ও ‘আগুনমুখা’র আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব, নাট্যকর্মী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং বিপুলসংখ্যক দর্শক উপস্থিত ছিলেন। নতুন নাট্যদলের যাত্রাকে স্বাগত জানিয়ে উপস্থিত সংস্কৃতিকর্মীরা নিয়মিত ও মানসম্মত নাট্যচর্চার মাধ্যমে পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।