সাংগঠনিক দায়িত্বে থেকেও ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার প্রতি বিশেষ আগ্রহ না দেখিয়ে এলাকার মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছেন এই দুই নেতা। তাঁদের জীবনযাপন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণে অনাগ্রহ স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
মাওলানা আব্দুল করিম ফরিদ জানান, ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের চেয়ে এলাকার মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা। ইউনিয়নের বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ সাধারণত ওয়ার্ড সভাপতিদের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে এসব বরাদ্দ ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে নিজের বসতবাড়িতে সরকারি টিউবওয়েল পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেও সফল হননি। পরবর্তী সময়ে ইউনূস সরকারের আমলে নিজের অর্থায়নে ব্যক্তিগতভাবে বাড়িতে টিউবওয়েল স্থাপন করেন। বর্তমানে তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ওই বাড়িতে বসবাস করছেন।
অন্যদিকে, তাঁর পুরোনো বাড়ি ৯ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় একটি মসজিদে সরকারি টিউবওয়েল স্থাপনে সহযোগিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই মসজিদে মুসল্লিদের পানির সংকট ছিল। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংগঠনের সবার পরামর্শক্রমে টিউবওয়েলটি মসজিদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। মসজিদের ইমাম ভাতা পাওয়ার জন্য ইসলামী ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রচেষ্টায় কনকদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মসজিদে টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। সামনে আরও কয়েকটি মসজিদে টিউবওয়েল স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি মসজিদ সংস্কারের জন্য ১০টি মসজিদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও মসজিদের তালিকা পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নিজের বাড়িতে প্রবেশের রাস্তা এখনো কাঁচা থাকার বিষয়ে আব্দুল করিম ফরিদ বলেন, এলাকার বিভিন্ন স্থানে ইট সোলিং ও মাটির রাস্তা নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, নিজের বাড়ির রাস্তার তুলনায় অন্য কিছু এলাকার মানুষের প্রয়োজন বেশি হওয়ায় সেসব রাস্তার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, কনকদিয়া ইউনিয়নের চারটি পিসি ঢালাই রাস্তা সংস্কারের জন্য সংসদ সদস্যের প্রচেষ্টায় অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি রাস্তার উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
মাওলানা আব্দুল করিম ফরিদ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, সংসদ সদস্য তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদে বাউফলের কোনো রাস্তা কাঁচা রাখবেন না। পর্যায়ক্রমে সব রাস্তা উন্নয়নের আওতায় আসবে, ইনশাআল্লাহ। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও রাস্তাঘাটসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়নে তাঁর প্রতি আমাদের প্রত্যাশা রয়েছে।”
ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল জলিলও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁদের বাড়িতে প্রবেশের রাস্তায়ও সমস্যা রয়েছে। তবে উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে যাঁদের প্রয়োজন বেশি, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।
সাইকেলে চলাচল এবং সাংগঠনিকভাবে মোটরসাইকেল ব্যবহারের সুযোগ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা আব্দুল করিম ফরিদ বলেন, “আমার চেয়ে অনেক যোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল রয়েছেন, যাঁদের এ ধরনের সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগতভাবে এমন সহযোগিতার প্রয়োজন মনে করি না। নিয়মিত সাইকেলে চলাচল করি, এতে শরীরেরও উপকার হয়। এ নিয়ে আমার মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা নেই, আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের দলের সংসদ সদস্যরাও সাধারণ জীবনযাপন করেন। কেউ কেউ এখনো কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে আমি তো সংগঠনের একজন ক্ষুদ্র কর্মী মাত্র।”
জানা গেছে, মাওলানা আব্দুল করিম ফরিদের পরিবারের সদস্যরাও সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বড় ছেলে মাওলানা এস এম আব্দুল্লাহ শিবলী বাউফল উপজেলা জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি। ছোট ছেলে এম সাইফুল্লাহ শোয়াইব ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগরীর একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাঁর স্ত্রী বেগম ফাতিমা ফরিদী কনকদিয়া ইউনিয়ন মহিলা জামায়াতের সহ-সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন।
পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিষয়েও কিছু তথ্য জানা গেছে। বড় ছেলে আব্দুল্লাহ শিবলী আগে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ চাকরির পাশাপাশি গণমাধ্যমে ইসলামী আলোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংগঠনের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি সেসব কাজ ছেড়ে এলাকায় ফিরে আসেন। বর্তমানে একটি ছোট মাদ্রাসায় চাকরি করছেন। এতে পরিবারের আর্থিক অবস্থায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল জলিল অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি স্বাবলম্বী না হলেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। তাঁদের দুজনেরই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রায় দুই যুগ ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা সংগঠনের রুকন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনের এক কর্মী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা ত্যাগী নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁদের সাধারণ জীবনযাপন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত।
সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত বিলাসিতা কিংবা বাড়তি সুযোগ-সুবিধার পরিবর্তে সাইকেলে চলাচল, সাধারণ জীবনযাপন এবং এলাকার মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বক্তব্য—এসব বিষয় কনকদিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের দুই নেতার জীবনযাত্রাকে আলোচনায় এনেছে। তাঁদের এই জীবনধারা স্থানীয় রাজনীতিতে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, ব্যক্তিগত চাহিদা ও জনস্বার্থের অগ্রাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।