কুয়াকাটা পটুয়াখালী প্রতিনিধি।।
পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমির দখল ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসা-সংলগ্ন বেড়িবাঁধের পাশে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের জমিতে সাইনবোর্ড স্থাপন ও দোকানঘর নির্মাণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মো. আলী হায়দার শেখের বিরুদ্ধে। এদিকে জমিটির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন অভিযোগকারী মোসা. মুক্তা আক্তার। তবে অভিযুক্তের দাবি, তিনি বৈধ দলিলের মাধ্যমে জমিটি কিনেছেন।
কুয়াকাটা জিরো পয়েন্টের পশ্চিম দিকে ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসা-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত বিরোধপূর্ণ জমিগুলো সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। জমির এসএ দাগ নম্বর ৫১৭৪, ৫১৭৫, ৫১৭৬, ৫১৭৭ ও ৫১৭৮ এবং বিএস দাগ নম্বর ১৫৮৬, ১৫৮৭, ১৫৮৮ ও ১৫৮৯। জমিটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই জমিতে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন স্থানে দোকানঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জমির সীমানা, পরিমাণ ও বর্তমান মালিকানা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড এবং সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন।
মোসা. মুক্তা আক্তারের অভিযোগ, তিনি ২০২২ সালে ৩৫৫০ নম্বর সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে এসএ ৩৪ নম্বর লতাচাপলী মৌজার ১৩৪৬ নম্বর খতিয়ানের ৫৭ শতাংশ জমি কিনেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে জমিটি ভোগদখল করে আসছেন। তাঁর দাবি, বিএস জরিপের সময় জমিটি অসতর্কতাবশত সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে যায়।
জমির মালিকানা পুনরুদ্ধারের জন্য খেপুপাড়া সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে ৮৩৯/২০২২ নম্বর মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে বলে তাঁর দাবি।
মুক্তা আক্তারের অভিযোগ, আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় আলী হায়দার শেখ ওই জমিতে প্রবেশ করে সাইনবোর্ড স্থাপন ও ঘর নির্মাণের মাধ্যমে দখলের চেষ্টা করছেন। তাঁকে বাধা দেওয়া হলেও তিনি তা উপেক্ষা করেছেন বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মহিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান মুক্তা আক্তার। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এবিএম মোশাররফ হোসেনের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
এদিকে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে জারি করা একটি চিঠিতেও লতাচাপলী মৌজার খাস খতিয়ানভুক্ত জমি এবং মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের মামলা-মোকদ্দমার বিষয় উঠে এসেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ৩৪ নম্বর জেএলভুক্ত লতাচাপলী মৌজার এসএ ১ নম্বর খতিয়ানের একাধিক দাগের জমি নিয়ে আদালতের রায়, ডিক্রি ও রেকর্ড সংশোধনের আবেদনসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে ১৮৮৩/২০১২ নম্বর লিভ টু আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে সিভিল রিভিউ পিটিশনসহ সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, কেবল বায়নাপত্র বা অনিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে সরকারি খাসজমির মালিকানা অর্জন করা যায় না; জমির মালিকানা ও হস্তান্তরের বৈধতা নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক আইন এবং নিবন্ধিত দলিল বিবেচনা করা জরুরি। ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার কারণে ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও চিঠিতে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মো. আলী হায়দার শেখ বলেন, “ওই জমি যারা দাবিদার, আমি তাদের কাছ থেকেও ক্রয় করেছি। তারা যার কাছ থেকে ক্রয় করেছেন, তাঁদের কাছ থেকেও আমার দলিল নেওয়া আছে।”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জমিটির পক্ষে তাঁরও ক্রয়সংক্রান্ত দলিল রয়েছে। ফলে বিরোধটির নিষ্পত্তিতে উভয় পক্ষের দলিল, মালিকানার ধারাবাহিকতা, সরকারি খতিয়ান এবং আদালতে চলমান মামলার নথি যাচাই করা জরুরি।
এ বিষয়ে মহিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শামীম হাওলাদার বলেন, “জমিসংক্রান্ত বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত জমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা দাবি, একাধিক পক্ষের ক্রয়দলিল এবং আদালতে মামলা চলমান থাকার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে। জমিটির প্রকৃত মালিকানা, সরকারি রেকর্ডের অবস্থা এবং সেখানে স্থাপনা নির্মাণের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এখন সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।