স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদীসংলগ্ন এলাকায় একটি চক্রের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার সময়েও ইলিশের বেচাকেনা চলছে। ক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে মাছ বিক্রিতে রাজি হন না চক্রের সদস্যরা। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করা হলে নানা প্রশ্নের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা হয়। এরপর ইলিশের আকার অনুযায়ী দাম জানিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি পয়েন্টে দালাল ও নির্দিষ্ট ক্রেতাদের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মাছ ধরা ও বিক্রির স্থানগুলোতে গোপনীয়তা বজায় রাখতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে চক্রের সদস্যরা বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার অনেকেই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রশাসনের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে ক্রেতা সেজে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের জেলে মো. মন্নান ও মো. মিজানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা প্রথমে পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। পরে ইলিশের আকারভেদে দাম জানান। তবে সরাসরি মাছ হস্তান্তর না করে চরকাজলের একটি নির্ধারিত ওয়ার্কশপে টাকা জমা দেওয়ার শর্ত দেন তারা। টাকা জমা দেওয়ার পর চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও জানান।
অনুসন্ধানে গলাচিপা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের অবৈধ বেচাকেনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট ও বড় শিবা; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চর আগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট ও চরবাংলা এবং রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী এলাকার নাম উঠে এসেছে। এসব স্থানে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরা ও কেনাবেচা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতকেও বিভিন্ন বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি চরবিশ্বাস ইউনিয়নের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে অসাধু জেলেদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের ট্রলার ধাওয়া করার মতো ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও অভিযান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ দিনে উপজেলায় ৩৪টি যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। একই সময়ে বাজারমূল্য ২৩ লাখ ৬২০ টাকা উল্লেখ করে প্রায় ১ লাখ ৫৭৫ মেট্রিক টন অবৈধ জাল জব্দ ও ধ্বংসের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, মৎস্য বিভাগ ও সরকারের বিভিন্ন সমন্বিত বাহিনীর উদ্যোগে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হলেও প্রতিটি এলাকায় প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখা এবং ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বজায় রাখতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে অবৈধভাবে ইলিশ শিকার ও বেচাকেনার অভিযোগগুলো তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং নদ-নদী ও বাজারকেন্দ্রিক নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।