মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে এ দুটি ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চরমোন্তাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারকে নদীপথে দূরের হাসপাতালে যাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ চরমোন্তাজের বাসিন্দা সোহেল ও জিনিয়া বেগমের সন্তান প্রসবের জন্য মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে স্বজনেরা স্পিডবোটে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্দেশে রওনা হন। প্রায় ২০ মিনিট চলার পর নদীর মাঝখানে স্পিডবোটেই সন্তান প্রসব করেন জিনিয়া বেগম। পরে নবজাতকটির মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছানোর আগেই এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পরিবার।
জিনিয়া বেগমের ভাই মো. বাচ্চু বলেন, “সকাল থেকেই আমার বোনের প্রসবব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়তে থাকলে স্পিডবোটের খবর দেওয়া হয়। কিন্তু সময়মতো স্পিডবোট ঘাটে না আসায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে নদীর মাঝখানে স্পিডবোটেই সন্তান প্রসব হয়। কিন্তু শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি। এরপর বোনকে বাড়িতে নিয়ে আসি। তিনি অসুস্থ থাকায় স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।”
পরিবারের অভিযোগ, প্রসবব্যথা শুরু হওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তবে নবজাতকের মৃত্যুর নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই দিন দুপুর ১টার দিকে চরমোন্তাজের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসরত ভাসমান মান্তা সম্প্রদায়ের মো. সজীব ও বিথী আক্তারের নবজাতকের মৃত্যু হয়। বিথী আক্তারের মা মালা বেগম জানান, সকাল থেকে তাঁর মেয়ের প্রসবব্যথা শুরু হয়। পরে ব্যথা তীব্র হলে তাঁকে স্থানীয় একজন চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। ওই চিকিৎসক বিথীকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে যাওয়ার মতো টাকা না থাকায় তাঁরা সেখানে যেতে পারেননি বলে জানান মালা বেগম। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় চিকিৎসকদের অনুরোধ করেও তিনি কাউকে বাড়িতে পাননি। পরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়েও কোনো চিকিৎসক না পেয়ে বাড়িতে স্থানীয় ধাত্রী আসমা বেগমের সহায়তায় সন্তান প্রসব করানো হয়। এরপর নবজাতকটির মৃত্যু হয়।
মালা বেগম বলেন, “আমি চরমোন্তাজের স্থানীয় চিকিৎসকদের অনেক অনুরোধ করেছি, কিন্তু কেউ আমার কাছে আসেননি। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়েও কোনো চিকিৎসক পাইনি। পরে স্থানীয় ধাত্রী আসমা বেগমের সহায়তায় বাড়িতে সন্তান প্রসব হয়। কিন্তু আমার নাতিকে বাঁচানো যায়নি। সময়মতো হাসপাতালে নিতে পারলে হয়তো শিশুটিকে বাঁচানো যেত।”
দ্বিতীয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায়ও জরুরি প্রসূতিসেবা, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের বসবাস চরমোন্তাজ ইউনিয়নে। সেখানে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রত্যাশিত সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
চরমোন্তাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক ইলিয়াস হোসাইন জানান, ইউনিয়নে প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি স্বাভাবিক প্রসব হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রসবের প্রায় সবই বাড়িতে অদক্ষ ধাত্রীদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ইউনিয়নে প্রায় ১৬০ জন গর্ভবতী মা রয়েছেন।
ইলিয়াস হোসাইন বলেন, “সরকার নির্ধারিত জনবলের অভাবে গর্ভবতী মায়েরা প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এবং একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার (এফডব্লিউভি) পদ থাকলেও দুটিই শূন্য। এ কারণে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, চরমোন্তাজ ইউনিয়নে মাঠপর্যায়ে পরিবার কল্যাণ সহকারীর তিনটি পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জনবলসংকটের কারণে ওই কর্মীকেও কেন্দ্রে বসে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এতে মাঠপর্যায়ে গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া ও সেবা দেওয়ার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চরমোন্তাজ ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা পরিবার কল্যাণ সহকারী রুবি আক্তার রুপা বলেন, গর্ভকালীন সময়ে তিনি বিথী আক্তারের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। তবে নবজাতকের মৃত্যুর খবর তিনি জানেন না বলে জানান। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিথী আক্তারের মা মালা বেগম দাবি করেন, রুবি আক্তার রুপা কখনো তাঁর মেয়েকে দেখতে আসেননি। এ বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চরমোন্তাজ থেকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে নদীপথে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়। তাঁদের দাবি, এ যাত্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে সব সময় স্পিডবোট পাওয়াও সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে, রাঙ্গাবালী উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় চিকিৎসাসেবার জন্য দ্বীপাঞ্চলের বাসিন্দাদের গলাচিপার ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রসবব্যথা শুরু হওয়ার পর দ্রুত ও নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে না পারা দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়রা জানান।
চরমোন্তাজে একই দিনে দুই নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিরাপদ প্রসবসেবা, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জরুরি রোগী পরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেজবা উদ্দিন বলেন, “ঘটনাটি আমরা শুনেছি। তবে রোগী আমাদের গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেননি; তারা চরমোন্তাজে চলে গেছেন। চরমোন্তাজের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জনবল দেওয়ার চেষ্টা করব।”
দুর্গম দ্বীপাঞ্চলে নিরাপদ মাতৃত্ব ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনই যথেষ্ট নয়; সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল, সার্বক্ষণিক সেবার সক্ষমতা এবং জরুরি রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। চরমোন্তাজের দুটি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা এসব সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।
সূত্র: স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য।