অভিযুক্ত দুই প্রকৌশলী হলেন পটুয়াখালী সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাশার এবং সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রকল্পের বাস্তব কাজ ও পরিশোধিত বিলের হিসাবে অসংগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে দুদক। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে আরও যাচাই-বাছাই ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দুটি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওয়ালিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত এক নোটিশে দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ আনা হয়। নোটিশে প্রকল্পের কাজের পরিমাণ, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ এবং বাস্তবে কাজ না হওয়া সত্ত্বেও অর্থ পরিশোধের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডব্লিউ-৩৫ প্যাকেজের আওতায় পটুয়াখালী সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া-চাটুয়া স্লুইসগেট-উত্তর বিরাজলা স্কুল সড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উন্নয়নকাজে প্রায় ৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। এ প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের পাশাপাশি প্রায় ৪৭ লাখ টাকার কাজ বাস্তবায়ন না করেই বিল দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ডব্লিউ-৩৬ প্যাকেজের আওতায় দুটি সড়কের মোট ১২ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার উন্নয়নকাজে প্রায় ৯৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। এ প্যাকেজে প্রায় ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল এবং প্রায় ৪৪ লাখ টাকার কাজ বাস্তবায়ন না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।
দুটি প্রকল্পে বাস্তবে কাজ না করেই প্রায় ৯১ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি, কাজের গুণগত মান যাচাই এবং বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ
এলজিইডির কারণ দর্শানোর নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দুই প্রকৌশলী আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ বাস্তবায়ন না হওয়া সত্ত্বেও বিল পরিশোধ করেছেন। এতে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের আওতাভুক্ত প্রায় ৯১ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বক্তব্য ও অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অভিযোগ নিয়ে যা বললেন অভিযুক্ত প্রকৌশলী
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাশারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনি যতটুকু জেনেছেন, এ বিষয়ে ওই দপ্তরের কাছ থেকেই জানুন।”
অন্যদিকে, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সড়ক পরিদর্শনে দুদক, বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনের অপেক্ষা
মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে পটুয়াখালীতে এলজিইডির কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনার পর অভিযোগের আওতাভুক্ত সড়কগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন দুদকের কর্মকর্তারা। সড়কের বাস্তব অবস্থা, নির্মাণকাজের পরিমাণ এবং পরিশোধিত বিলের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সড়ক পরিদর্শন শেষে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পটুয়াখালীর সহকারী পরিচালক তাপস বিশ্বাস বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের মনে হয়েছে, পরিশোধিত বিলের মধ্যে প্রায় ৯১ লাখ টাকার ভুয়া বিল রয়েছে। নিরপেক্ষ প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তাঁরা সরেজমিনে এসেছেন। সড়কের বিভিন্ন উপকরণের গুণগত মান পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা প্রতিবেদন দেবেন। সেই প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অভিযোগের সত্যতা থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন ও পরবর্তী অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।
সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ। সে ক্ষেত্রে বাস্তব কাজের সঙ্গে বিলের হিসাবের অসংগতি থাকলে তা সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও প্রকল্প তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার দুটি সড়ক প্রকল্পে প্রায় ৯১ লাখ টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগের পর দুদকের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
সূত্র: এলজিইডির নোটিশ ও দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য।