অভিযোগকারীদের দাবি, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় এবং আর্থিক সুবিধার ভিত্তিতে কিছু ব্যক্তিকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগকারীদের বক্তব্য। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি।
জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাসহ স্থানীয় বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ফোরামে সার ডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা ও অসন্তোষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলো সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রকৃত চিত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগ উঠেছে, দশমিনা সদর ও গলাচিপা সদর ইউনিয়নে নতুন সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং উন্মুক্ত আবেদনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এতে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা কয়েকজন ব্যবসায়ী আবেদন ও নিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও নির্ধারিত সরকারি শর্তের পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, আবেদনকারীদের তালিকা, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হলে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।
গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করেও নতুন করে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, ডিলারশিপ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। পাশাপাশি আবেদনকারীদের তালিকায় অগ্রাধিকার পেতে তিন লাখ টাকা লেনদেনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কোনো নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত না হওয়ায় বিষয়টিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্য এবং আবেদনকারীদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে আবেদন গ্রহণ, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, সুপারিশ ও চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি সার বিতরণব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশঙ্কা, অযোগ্য বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে ডিলারশিপ গেলে সার সরবরাহ ও বিতরণে স্বচ্ছতা বিঘ্নিত হতে পারে। এর ফলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি কিংবা কৃষকদের ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
কৃষকদের মতে, সার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণ। সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পাওয়া না গেলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, কৃষকের স্বার্থ, পণ্যের সহজলভ্যতা এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সার বিতরণব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মুহাম্মদ আমানউল্লাহর দপ্তরের বক্তব্য হিসেবে জানানো হয়েছে, সার ডিলার নিয়োগ সরকারি নীতিমালা ও নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং এ ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ নেই।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপপরিচালক ড. মুহাম্মদ আমানউল্লাহ, সাবেক জেলা প্রশাসক ড. শরীফ হোসেন চৌধুরী এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কমিটির বিস্তারিত বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, বিতর্কিত নিয়োগপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের জন্য স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হোক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সার ডিলার নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে একদিকে কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার পাওয়ার অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বাড়বে। তাই অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।